সোমবার, ২৬ অগাস্ট ২০১৯, ০২:১৩ পূর্বাহ্ন

ডেঙ্গুজ্বর থেকে কীভাবে বাঁচবেন

ডেঙ্গুজ্বর থেকে কীভাবে বাঁচবেন

ডেঙ্গুজ্বর থেকে কীভাবে বাঁচবেন

ডা. মোহাম্মদ হাসান জাফরী : আশঙ্কাজনকভাবে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রতিদিনই আসছে। ডেঙ্গু নিয়ে সকলে উদ্বিগ্ন বিশেষ করে, রাজধানীবাসীদের মধ্যে ডেঙ্গু আতঙ্ক বিরাজ করছে ব্যাপকভাবে। নিজেদের সতর্ক রাখার পাশাপাশি সকলের সচেতনতাই পারে কেবল নাগরিক জীবনে স্বস্তি দিতে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ঢাকা শহরে প্রতি ঘণ্টায় দুই দশমিক তিনজন ব্যক্তি ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। চলতি মাসে এ রোগের প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কি না নাগরিক জীবনকে অস্থিরতায় ফেলতে পারে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। সকলের সর্বোচ্চ সতর্কতার মধ্যেই কেবল এ ক্রান্তিকালীন দুরবস্থা নিরাময় করা সম্ভব।

গতমাসে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি ৪৭টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চলতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মোট ২৩০০ এরও অধিক রোগীর মধ্যে শুধু জুন মাসেই আক্রান্ত হন ১,৭১৩ জন, যা বিগত তিনবছরে জুন মাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি। এছাড়াও জানুয়ারিতে ৩৬, ফেব্রুয়ারিতে ১১৮, মার্চে ১২, এপ্রিলে ৪৪, মে মাসে ১৩৯ এবং চলতি জুলাই মাসের প্রথম চার দিনে ৩১৮ জন আক্রান্ত হয় ডেঙ্গুজ্বরে। আক্রান্তদের মধ্যে এপ্রিল মাসে দুজন মৃত্যুবরণ করেন।

ফ্ল্যাভিভাইরিডি পরিবার ও ফ্ল্যাভিভাইরাস দলের অন্তর্ভুক্ত মশাবাহিত এক সূত্রক আরএনএ (RNA) ভাইরাসের সংক্রমণই হচ্ছে ডেঙ্গু ভাইরাস বা ডেঙ্গি ভাইরাস, যা ডেঙ্গুজ্বরের জন্য দায়ী।

এডিস ইজিপ্টি মশা (A. aegypti) ডেঙ্গু ভাইরাসসহ ইয়েলো ফিভার ভাইরাস, জিকা ভাইরাস, চিকুনগুনিয়া ভাইরাসেরও বাহক। এই ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ পাওয়া গিয়েছে। যাদের প্রত্যেকেই পূর্ণরূপে রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। জীবাণুবাহী এডিস মশা কাউকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। এই রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে যদি কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ায় তাহলে সেই মশা ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এই জীবাণুবাহী মশাটি যখন অপর কোনো ব্যক্তিকে কামড়ায় তখন তার দেহে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে খুব সহজে একজন থেকে অপরের দেহে এ রোগের বিস্তার হতে দেখা যায়। ডেঙ্গু প্রধানত তিন ধরনের হয়ে থাকে, ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার, ডেঙ্গু শকসিনড্রোম।

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত অল্পদিনে সুস্থ হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিতভাবে অসুস্থতা বাড়তে থাকে এবং মৃত্যুও ঘটতে দেখা যায়। সাধারণত ভাইরাস জ্বরের যে লক্ষণ, তার সবই ডেঙ্গুজ্বরে থাকে। ডেঙ্গুজ্বর হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে- সারা শরীরের মাংসপেশিতে, বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধিতে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। জ্বর হওয়ার ৪ বা ৫ দিনের সময়ে এলার্জি বা ঘামাচিরমতো সারা শরীরজুড়ে স্কিন র‌্যাশ বা লালচে দানা দেখা যায়। এ জ্বর কম বা বেশি উভয়ই হতে পারে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্বর ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। খাবারে অরুচি ও বমি বমি ভাব হয়।

সাধারণত জ্বর তিন-চার দিন পর ভালো হয়ে যায়, তবে রক্তের প্লেটিলেট কমতে থাকে। কখনো মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে আবার জ্বর আসে এবং শরীরে র‌্যাশ দেখা দেয়। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রচণ্ড মাথাব্যথার সাথে শরীরেও প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয় এবং জ্বর থাকে। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তি কখনও চোখের পিছনে ব্যথা অনুভব করে। যাদের বেশি জ্বর থাকে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে যেমন চামড়ার নিচ, নাক, মুখ, দাঁত ও মাড়ি, চোখের মধ্যে এবং চোখের বাহিরে, কফ, বমি ও পায়খানার সাথে রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হতে পারে আবার রোগীর রক্তনালি থেকে প্লাজমা লিকেজের কারণে বুকে ও পেটে পানি জমতে পারে। পানিশূন্যতা বেশি হওয়ায় প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে, অনেকসময় লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনি আক্রান্ত হয়ে রেনাল ফেইলিউর ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে। চিকুনগুনিয়া সাধারণত দ্বিতীয় বার হয় না তবে ডেঙ্গু দ্বিতীয় বার হলে জটিলতা আরও বেড়ে যায়, বিশেষকরে শিশুদের ক্ষেত্রে। বিশেষত চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের কারণে ডেঙ্গুজ্বরও চার বার হতে পারে।

সাধারণত শহর এলাকায় এ জ্বরের প্রকোপ লক্ষ্য করা যায় বেশি। খুবই সাধারণ কিছু নিয়মকানুন, যা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সবসময় সকলের সচেতনতার জন্য প্রচারিত হয়, তা মেনে চলে আমরা এ রোগের প্রকোপ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি। দুই সিটি কর্পোরেশনের মশানিধন অভিযান কর্মসূচি পরিচালনাসহ এ বিষয়ে আমাদের অনেক কিছুই করণীয় আছে, বিশেষভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিক দিয়ে জনগণের সচেতনতা খুবই জরুরি। মশার প্রজননক্ষেত্র যাতে গড়ে ওঠতে না পারে সেদিকে সকলকে নজর দিতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে মশানিধন অভিযানে নিজেদের সম্পৃক্ত করে, মশার কামড় প্রতিরোধে দিনে রাতে ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে।

আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়াসহ নতুনভাবে এ রোগের জীবাণুবাহী মশার আরও প্রসার যাতে না ঘটে, সেজন্য সকলকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অভিজ্ঞতার আলোকে সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই দেশবাসী, বিশেষ করে রাজধানীবাসী ডেঙ্গু থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। প্রয়োজন শুধু সবার সচেতনতা আর সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ।

লেখক : কলামিস্ট

১০.০৭.২০১৯

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com