বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:১২ অপরাহ্ন

জীবনজুড়ে সহনশীলতা

জীবনজুড়ে সহনশীলতা

জীবনজুড়ে সহনশীলতা

আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী

সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার মিশ্রণে আমাদের জীবনতরী বয়ে চলে। পাওয়া না পাওয়ার সমীকরণ চলতেই থাকে জীবনজুড়ে। কারো চাওয়ামাত্রই কাক্সিক্ষত বস্তুটি অর্জিত হয়ে যায়। কারো একটি জীবন পেরিয়ে যায় না পাওয়ার বেদনাকে সঙ্গী করে। এভাবেই জীবনরবি এক সময় ডুবে যায় শত স্বপ্ন বুকে নিয়ে। এই যে পাওয়া না পাওয়ার সমীকরণ, এই যে অধরা স্বপ্নের করুণ পরিণতি এ ক্ষেত্রে কালজয়ী জীবনাদর্শ ইসলাম কি বলে?
শত চেষ্টার পরেও যখন কাক্সিক্ষত বস্তুটি না মিলে, হতাশারা যখন মিছিল করে এসে হৃদয় যমীনকে দুমড়ে মুচড়ে দেয় স্বভাবধর্ম ইসলাম তখন আহত হৃদয়ে সান্ত্বনার প্রলেপ মাখিয়ে দেয়। প্রচণ্ড দাবদাহে এক পশলা বৃষ্টি উপহার দেয়।

এই যে বিপদ আপদ একের পর এক আসতে থাকে, কখনো ভয়, কখনো ক্ষুধা, কখনো বা নানাবিধ সংকটে আমাদের জীবন বিষিয়ে ওঠে। এগুলো কেন আসে আসে? কেন আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর বিপদ চাপিয়ে দেন? মানবজাতির মুক্তির লক্ষ্যে নাযিল হওয়া ঐশিগ্রন্থ পবিত্র কুরআন মাজিদে এর সঠিক দিক নির্দেশনা রয়েছে। বিপদ-আপদে একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবেÑ এ বিষয়ে রয়েছে কালজয়ী পথপ্রদর্শন।

ইরশাদ হয়েছে, আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো (কখনো) কিছুটা ভয়-ভীতি দ্বারা, (কখনো) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনো) জানমাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদেরকে, যারা (এরূপ অবস্থায়) সবরের পরিচয় দেয়। যারা তাদের কোন বিপদ দেখা দিলে বলে ওঠে, আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমাদেরকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। (সূরা বাকারা : ১৫৫- ১৫৬)

এ দুটো আয়াত থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি জীবনজুড়ে বিপদাপদের আগমন এটা একজন মুমিনের প্রতি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে পরীক্ষা। এ সব প্রতিকূল পরিবেশে একজন মমিন সব সময় ধৈর্যের পরিচয় দেবে। আর সবর হচ্ছে দুঃখ-বেদনা সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালার প্রতি কোন অভিযোগ না তোলা; বরং আল্লাহ তায়ালার ফায়সালার প্রতি বুদ্ধিগতভাবে সন্তুষ্ট থাকা।

খ্যাতিমান মুফাসসির, লেখক ও ঐতিহাসিক হাফেজ আবুল ফিদা ইমাদুদদ্দীন ইসমাইল ইবনে উমর (জন্ম: ৭০০হি. মৃত্যু: ৭৭৪হি.)-যিনি হাফেজ ইবনে কাসির রহ. নামে পরিচিতÑ তার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরূল কুরআনীল আজিমে সবরের ব্যাখা করতে গিয়ে বলেন, আমিরুল মুমিনিন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন: সবর দু ধরনের। একটি হচ্ছে বিপদের সময় সবর করা। আরেকটি হছে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকার কষ্ট সহ্য করা। (তাফসিরুƒল কুরআনিল আজিম : ১/১১২ দারুল হাদিস, কায়রো, মিশর থেকে প্রকাশিত সংস্করণ)

আমাদের জীবনে দুঃখ-কষ্ট একের পর এক আসতেই থাকবে। এতে বিচলিত হওয়া যাবে না। হতোদ্যম হয়ে হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। বরং পাহাড়সম ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিচয় দিতে হবে। ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, হে মুমিনগণ! সবর অবলম্বন কর, (ইসলামের শত্রুদের সাথে) মোকাবিলার সময় অবিচলতা প্রদর্শন কর এবং সীমান্ত রক্ষায় স্থিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় করে চল, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা আলে ইমরান : ২০০)

এভাবে জীবনজুড়ে প্রতিটি প্রতিকূল মুহূর্তে সুদৃঢ় সবরের পরিচয় দেয়া পবিত্র কুরআন মাজিদের কালজয়ী নির্দেশনাগুলোর অন্যতম। বিভিন্ন আয়াতে সবরের শিক্ষা দেয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী অনেক ব্যক্তি ও জাতির সবর ও দৃঢ়তার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। দৃপ্ত কণ্ঠে কুরআন ঘোষণা দিয়েছে, যারা ঈমান এনে তাকওয়ার পথে অটল অবিচল থেকে সবরের পরিচয় দিয়েছে বিজয়মালা তাদের গলায়ই শোভা পেয়েছে। চূড়ান্ত সফলতা তাদের কপালে চুম্বন করেছে। তারা নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হয়েছেন।

ইরশাদ হয়েছে, আর আমি তাদের মধ্যে কিছু লোককে, যখন তারা সবর করল, এমন নেতা বানিয়ে দিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথপ্রদর্শন করত এবং তারা আমার আমার আয়াতসমূহে গভীর বিশ্বাস রাখত। (সূরা সাজদা : ২৪)

এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সবর তথা ধৈর্যকে নেতৃত্ব লাভের উপায় বলে সাব্যস্ত করেছেন। যারা জীবনজুড়ে সবরের পরিচয় দেয় সফলতা ও নেতৃত্ব তাদের কাছে টেনে নেয়।

এই যে দেখুন হযরত ইউসুফ (আ.)। এক জীবনে তিনি তিনি কতটা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছেন। কাছের মানুষগুলো তাকে কতটা দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছে। তাঁর সফলতার পথকে রুদ্ধ করে দিতে তার ভায়েরা হেন প্রয়াস নেই যা তারা অবলম্বন করেনি। কিন্তু হযরত ইউসুফ (আ.) কখনো ভেঙে পড়েননি। হতোদ্যম হয়ে হাল ছেড়ে দেন নি। ইস্পাত কঠিন মনোবল আর সুদৃঢ় পাহাড়ের মত অটল থেকে সবরের রাজপথে অবিচলতা প্রদর্শন করেছেন। তিনি আপন প্রতিপালকের ফায়সালায় সন্তুষ্ট থেকে তাঁর উপরই সর্বোচ্চ ভরসা রেখেছেন। আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতেই তাকে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করিয়েছেন। নেতৃত্ব ও মর্যাদা ঈর্ষণীয় আসনে সমাসীন করেছেন। এটাই আল্লাহ তায়ালার শাশ্বত নিয়ম। যেখানেই তাকওয়া ও সবরের সম্মিলন সেখানেই সফলতার স্ফুরণ।

ইরশাদ হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে ও ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহ এরূপ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না। (সূরা ইউসুফ : ৯০)
ধৈর্য্য যেমন পার্থিব জীবনে সুফল বয়ে আনে আখেরাতেও এর সুফল বিস্তৃত। সীমাহীন সওয়াব ও নেকির পাহাড় অর্জিত হয় এই সওয়াবের মাধ্যমে। ইরশাদ হয়েছে, যারা ধৈর্যধারণ করে তাদেরকে তাদের সওয়াব দেয়া হবে অপরিমিত। (সূরা যুমার : ১০)

তাইতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধৈর্যকে একটি আলোকবর্তিকা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই ধৈর্য দুনিয়াতেও ব্যক্তির জীবনে আলোর ধারা বয়ে নিয়ে আসে। আর আখেরাতেও তার জন্যে সীমাহীন আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায়।

হযরত হারেস ইবনে আসেম আশআরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনÑধৈর্য হচ্ছে একটি আলোকবর্তিকা। (সহিহ মুসলিম : ১/২০৩)
বিপদাপদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুমিনের গোনাহ মিটিয়ে দেন। তার মর্যাদা সুউচ্চ করেন।

হযরত আবু সাঈদ ও আবু হুরাইরা (রা.) যৌথভাবে হাদিসটি রেওয়ায়েত করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনÑ মুসলমানের যত দুঃখ কষ্ট, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, পেরেশানী, বিপদাপদ আসুক না কেন এমনকি পায়ে যদি সামান্য কোন কাঁটাও বিদ্ধ হয় এতেও আল্লাহ তার গোনাহ মিটিয়ে দেন। (সহীহ বুখারি : ১/৫৬৭৭ সহিহ মুসলিম: ৪/১৯৯৪)

একজন মুমিন কোন অবস্থায়ই হতোদ্যম হতে পারে না। হালছাড়া কোন মুমিনের স্বভাব নয়। সে পারে না মহামহিম আল্লাহ তায়ালার উপর থেকে ভরসা পরিত্যাগ করতে। তাই আসুন, আমরা সুদৃঢ় মনোবলের পরিচয় দেই। প্রতিকূল মুহূর্তে ইস্পাত কঠিন মানসিকতা প্রদর্শন করি। ধৈর্য নামক আলোকবর্তিকায় আলোকিত হয়ে দুনিয়া আখেরাতে সফলতার সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হই। আল্লাহ সকলকে তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : খতীব: আউচপাড়া জামে মসজিদ টঙ্গী গাজীপুর

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com