বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২১ অপরাহ্ন

জাতীয়তাবাদবিরোধিতা উম্মাহর জন্য কতটা কল্যাণকর এখন?

জাতীয়তাবাদবিরোধিতা উম্মাহর জন্য কতটা কল্যাণকর এখন?

জাতীয়তাবাদবিরোধিতা উম্মাহর জন্য কতটা কল্যাণকর এখন?

সগীর আহমদ চৌধুরী : ইসলামপন্থিদের অনগ্রসরতার বড় একটা কারণ হচ্ছে, অবাস্তব কিছু থিউরি কামড়ে পড়ে থাকা, বাস্তবতা উপলব্ধি করতে না পারা এবং কোন জিনিসটি অগ্রগণ্য ও প্রাধান্য পাবার যোগ্য সেটি উপলব্ধি করতে না পারা। যেমন ধরুন জাতীয়তাবাদের উগ্র বিরোধিতা। জাতিরাষ্ট্র নাকি ইসলামের পছন্দনীয় নয়, ইসলাম নাকি সর্বপ্রকার রাষ্ট্রসীমা ও সীমান্ত ভেঙে এবং সকল জাতি-বর্ণ-গোত্র-গোষ্ঠীভিত্তিক গোলামি থেকে মুক্ত করে মানবতার একই ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ করতে চায়, আর এতেই নাকি মানবতার মহামুক্তি।

এক আকাশকুসুম কল্পনায় বিভোর ইসলামপন্থিরা। কথা তো অনেক জযবার, অত্যন্ত আবেগের; বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের শাসন হবে, সারা দুনিয়া হবে মুসলমানদের! কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব? জাতিরাষ্ট্র এখন দুনিয়ার বাস্তবতা, বর্ণ-ভাষা-গোত্র ও গোষ্ঠীর ভিত্তিতে বিশ্বের জাতিসমূহ বিভিন্নভাবে বিভক্ত, স্বাধীন বা স্বাধীন হতে চায়। স্বাধীন জাতিসমূহ তাদের রাষ্ট্রকে মজবুত কাঁটাতার দিয়ে উত্তরোত্তর সুরক্ষিত করছে, সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে রেখেছে, নৌ-স্থল-বিমানে বাহিনী তৈরি করে স্বস্ব ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ব্যবস্থা করেছে।

এমন মজবুত সীমান্ত ভেঙে, নৌ-স্থল-বিমান বাহিনীর মোকাবেলা করে বিশ্বকে একই সাম্রাজ্যের অধীনে এনে মানবতার কথিত ‘মহামুক্তি’ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কত সহস্র, লাখো-কোটি নিরীহ মানবতার রক্তের বন্যা বইবে সেই কল্পনা কি করা যায়? ফিলিস্তিনী, আরাকানি, ইউঘুর, কাশ্মীরী, চেচেন, বসনিয়ান; একভারতেই মণিপুরী, নাগা, তামিলসহ অনেক জাতি-গোষ্ঠী স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। সেখানে তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, দমিয়ে দেওয়ার এ কেমন কল্পনা? এটা কি এতো সহজ?

জাতিসমূহ কি এটাকে মুক্তি হিসেবে মেনে নেবে? নাকি কঠিন পরাধীনতা এবং নিষ্ঠুর গোলামি আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে সীমাহীন সমরে অবতীর্ণ হতে উদ্বুদ্ধ হবে? মুসলিমরা যখন শক্তিহীন, মানসিক-সাংস্কৃতিকভাবে মুসলমানরা যেখানে পরাধীন এবং তাদের রাষ্ট্রসমূহ যেখানে অর্থনীতিকভাবে পরনির্ভর সেই মুহূর্তে বিশ্বমানবতার একতার অলীক কল্পনার অর্থ কি? তাহলে আমরা কি বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেবো? ভারতের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাবো? এটা তো আত্মহত্যার শামিল। অতএব জাতীয়তাবাদ বিরোধী এই উগ্র প্রজেক্টে মুসলিম উম্মাহর জন্য এই মুহূর্তে কোনো কল্যাণ নেই।

হ্যাঁ, মুসলমানদের যদি একটি যুক্তরাষ্ট্র থাকত, রাশিয়া-চিন-ফ্রান্স কিংবা অন্তত ভারত থাকতো তাহলে তার মুখে হয়তো বিশ্বজাতিকে এক হওয়ার আহ্বান শোভা দিত। আগে তো সেই শক্তি চাই, সেই ধরনের একখানা মুসলিম রাষ্ট্র চাই; প্রবল পরাক্রমশালী, শক্তিধর, উন্নত বিচার-ব্যবস্থার, মানবতাবাদী। আগে তো সেই কর্মসূচিই প্রাধান্য পাবার কথা, তা না করে কতো পরের পরের পুঁথিকথা গাওয়া হচ্ছে। আগে নিজের জাতিকে শিক্ষায়, কর্মদক্ষতায় ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ করো। প্রিয় মাতৃভূমি, প্রিয় ভূখণ্ড ও প্রিয় দেশটাকে গড়ে তোল। তাকে অর্থনীতি, সমরশক্তি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি গবেষণায় শক্তিশালী করো। তা না করে বিশ্বের জাতীয়তাবাদী ব্যবস্থাকে ভাঙার নামে, সেটা ভেঙে আন্তর্জাতিক খেলাফত কামেয়ের অলীক কল্পনায় এবং তার জন্য গ্লোবাল জিহাদের নামে সর্বাগ্রে মুসলিম দেশসমূহকে কানা করার যে মানহাজ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সেটা পাগলামো ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

শক্তিশালী, পরাক্রমশালী ও প্রতিপত্তিশালী আমেরিকা-ইউরোপ-রাশিয়া-চীন-ভারতকে ভাঙার কল্পনার আগে নিজ নিজ দেশকে তাদের তুলনায় শক্তিশালী করতে হবে, পরাক্রমশালী করতে হবে, প্রতিপত্তিশালী করতে হবে। সেই ধরনের কোনো বিনির্মাণের কর্মসূচি না দিয়ে বরং নিজের দেশটাকে কানাই করে দিতে চায় একশ্রেণির বিপ্লবীরা। এই কানা দেশ নিয়ে মোকাবেলা করবে তারা আমেরিকার? এতে আখেরে আমও যাবে, চালাও হারাতে হবে। একুলও যাবে, ওকুলও যাবে। হয় এটা মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ অথবা কোন জিনিসটা অগ্রগণ্য হবে এবং কোন জিনিসটা পরে করার সেই বোধ-জ্ঞান এখনও ইসলামপন্থিদের হয়ইনি, সেই আক্কেল-জ্ঞান তাদের মোটেও নেই। মানে এক মহাউন্মাদনার নাম এটা, পাগলামোর লংকাকাণ্ড এসব।

লেখক : রাজনীতিক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com