রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:১৫ অপরাহ্ন

জাকাতপ্রার্থীদের স্বাবলম্বী করুন | জুলফিকার জহুর

জাকাতপ্রার্থীদের স্বাবলম্বী করুন | জুলফিকার জহুর


হাফেজ মাওলানা সাইয়েদ জুলফিকার জহুর। আলোকিত এ মানুষটি পরিচিত তার বহুমুখী প্রতিভায়। ধানমন্ডি তাকওয়া মসজিদের খতিব হিসেবে আছেন ২০ বছর যাবত। ধর্মীয় অঙ্গনের পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানেও তার রয়েছে সমান পারদর্শীতা। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দাওরা সম্পন্ন করার সঙ্গে দিল্লী কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন।ডিগ্রি নিয়েছেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও।একজন যুগসচেতন আধুনিক আলেম ও আর্কিটেক্ট হিসেবে সর্বমহলে তিনি পরিচিত। সম্প্রতি রমজানের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শীলনবাংলার সহসম্পাদক তানজিল আমির-


প্রশ্ন : রমজান হলো অফুরান কল্যানের মাস,রমজানের সেই অফুরান কল্যানগুলো কী এবং তা অর্জন হবে কিভাবে?
উত্তর :  রমজানের কল্যানগুলো মোটামোটি তিন প্রকার।এক নাম্বার হলো পরিবেশগত কল্যান। রমজানে ইবাদাত ও ভালো কাজ করার একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সে আবহ মানুষের মাঝে ভালো ও উত্তমতার স্বতস্ফুর্ত প্রেরণা সৃষ্টি করে। দি¦তীয় হলো শারিরীক ও মানসিক উৎকর্ষতা।রোজা ও অন্যান্য আমলগুলোর প্রভাবে মানুষের শারিরীক ও মানুষিক উৎকর্ষতা সাধন হয়।এর মাধ্যমে একজন মানুষ তাকওয়ার পথে অগ্রসর হতে পারে। কিন্তু রমজান শেষ হলে পরিবেশগত কল্যানটি শেষ হয়ে যায়। ঠিকমত সচেষ্ট না থাকলে শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষতাও অনেকটা হারিয়ে যায়।কিন্তু রমজানের একটি কল্যান তখনো বাকি থাকে,সেটি হলো ফুরকান। কিন্তু এই ফুরকানকে ধারণ করার মানসিকতা ও বোধের অভাব রয়েছে আমাদের। বিষয়টা হলো আল্লাহ আমাদের রমজান দান করেছেন কুরআন সহকারে, ফুরকান লাভ করার জন্য। কুরআন ও ফুরকানের মাঝে পার্থক্য কি? কুরআন অধ্যায়নের ফলে একজন মানুষের অন্তরে যে বোধ সৃষ্টি হয়,সে বোধই তাকে জীবনভর কল্যানের পথে উৎসাহিত করে।এবং তার জীবনকে সঠিক ও সুন্দর পথে পরিচালনা করে। এ জন্য ফুরকানীয়বোধ অর্জন ছাড়া রমজানের কল্যাণ বাকী থাকে না। ব্যাপারটি হলো,এই যে রমজানে আমি কুরআন অধ্যয়ন করবো, তাফসির পড়বো,এগুলোর মাধ্যমে আমার অন্তরে যেন ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী বোধ সৃষ্টি হয়।এটিই রমজানের কল্যান। সুতরাং বলা যায়,অনেক কল্যান নিয়েই রমজান আসে, কিন্তু ফুরকান অর্জন না করায় সে কল্যাণগুলো থেকে আমরা উপকৃত হইনা।f

http://www.alokitobangladesh.com/uploads/news/13647235_1335542683124474_2111372242_o.jpg

প্রশ্ন : একজন রোজাদার কিভাবে তার রোজার মূল্যায়ন করবে?
উত্তর: রমজান তো প্রশিক্ষণের মাস। রোজার মাধ্যমে একজন মুুমিন তার ইন্দ্রীয় ও রিপূর সংযমের প্রশিক্ষণ লাভ করে। শিকারীরা যখন বন্য পশু শিকার করে, তখন বিভিন্ন কৌশলে ধীরে ধীরে বশ করে। তেমনী রমজানে ক্ষুধা, পিপাসা ও অন্যান্য কষ্টের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য ইন্দ্রীয়গুলোকে আমরা বশ করি। আর এভাবে তাকওয়ার শক্তি অর্জন করে ইন্দ্রিয় বা রিপুর দ্বারা পরিচালিত না হয়ে সেগুলোকে আল্লাহর হুকুম অনুসারে পরিচালনার চেষ্টা করা। এভাবেই রোজাদার তার রোজা থেকে উপকৃত হবে। কিন্তু তা না করে গড্ডালিকাপ্রবাহে আমরা সবাই রোজা রাখছি, রোজার প্রকৃত মূল্যায়ন করছি না।এ জন্য আমাদের আত্মসমালোচনা করা দরকার। রমজান এসেছে আমাদের কলুষিত আত্মাকে ধুয়ে মুছে ছাপ করার জন্য। রমজানের এ সূযোগ যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি,তাহলে বাকী এগারো মাস আমাদের আত্মা সঠিকভাবে পরিচালিত হবে।

প্রশ্ন: রমজান হলো কোরআন নাজিলের মাস। কোরআন তিলাওয়াত,কোরআন শিক্ষা এবং কোরআন সম্পর্কে প্রত্যেকের কতটুকু জানা উচিত।এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় কতটুকু?

উত্তর : কোরআন কেন্দ্রিক জীবন পরিচালনার জন্যই তো রমজানের আগমন। একজন মুসলমান হিসেবে কোরআন পড়তে পারা ও কোরআন সম্পর্কে জানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য জরুরি। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের শতভাগ দায় রয়েছে। কারন যে মানুষটির সম্পর্ক কোরআনের সঙ্গে, সে আমানতদার ও বিবেকবান হয়,অন্যের ক্ষতির কারন হয়না, হৃদয়ের ব্যবহার করতে শিখে । এ সকল গুনাবলী সম্পূর্ণ একজন মানুষ তো রাষ্ট্রের আমানতদার নাগরিক। সে অফিসে দুর্নীতি করবে না। ব্যবসায়ী হলে পণ্যে ভেজাল দিবে না। মাল সিন্ডিকেট করবে না। এমন মানুষগুলো যখন বাইরের দেশে যায়। তখন রাষ্ট্রের জন্য ভালো পয়গাম নিয়ে যায় । যখন সে ফিরে আসে দেশের কল্যাণ নিয়েই ফিরে আসে। তাদের মাধ্যমে দেশের সুনাম হয়। পক্ষান্তরে যার মধ্যে কোরআনের নূর নেই। সে রাষ্ট্র, সমাজ,পরিবার সবার জন্যই কষ্টের কারণ হয়। এ জন্য দেশের প্রতিটি নাগরিকের কোরআন শেখার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।


একজন দিচ্ছে, আরেকজন নিচ্ছে। যে জাকাত নিচ্ছে তার যেমন হক রয়েছে, যে দিচ্ছে তারও হক রয়েছে। এখানে দুজন দুজনার কল্যাণের কথাই চিন্তা করে। একজন যখন অপরজনের কল্যাণ কামনা করে, তখন দুটি জিনিস অনুপস্থিত থাকে। একটি হলো লোভ, অপরটি ক্ষোভ।


প্রশ্নঃ একটি দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জাকাতের ভুমিকা কতটুকু?
উত্তরঃ দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় জাকাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারন সম্পদ মানুষের জীবনযাপন ও চিন্তাভাবনায় একটা বৈষম্য সৃষ্টি করে, ধনী-গরীবের মাঝে একটা দূরত্ব তৈরি করে। জাকাত এই বৈষম্য ও দূরত্ব কমিয়ে আনে। কারণ জাকাত কোন করুণা নয়। একজন দিচ্ছে, আরেকজন নিচ্ছে। যে জাকাত নিচ্ছে তার যেমন হক রয়েছে, যে দিচ্ছে তারও হক রয়েছে। এখানে দুজন দুজনার কল্যাণের কথাই চিন্তা করে। একজন যখন অপরজনের কল্যাণ কামনা করে, তখন দুটি জিনিস অনুপস্থিত থাকে। একটি হলো লোভ, অপরটি ক্ষোভ। এই লোভ ও ক্ষোভ যখন মানুষের মাঝে কম থাকে। তখন যার নেই, সে যার আছে তার জন্য হিংসা বিদ্বেষ করে না। পক্ষান্তরে যার আছে, সে যার নেই তার জন্য অকাতরে দান করে থাকে। এভাবে জাকাত ধনী-গরীবের দূরত্ব কমিয়ে আনে। আর এ দূরত্ব কমার ফলে সামাজিকভাবে কোন বৈষম্য থাকে না। এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়। সুতরাং বলা চলে, দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যতার জন্য নাগরিকদের সুন্দর মন দরকার। আর এ সুন্দর মন যদি তাকওয়াভিত্তিক পরিচালিত হয়, তাহলে কিছু পবিত্র মানুষ সৃষ্টি হবে। যারা দেশের অর্থনীতিকে সুন্দর ও  স্বাবলম্বীর পথে পরিচালিত করবে।

প্রশ্ন : দেশের বিত্তভানরা সঠিকভাবে জাকাত আদায়ে অবহেলা করে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে?
উত্তরঃ রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পর হযরত আবু বকর রা. এর খেলাফতের সময় কিছু সম্প্রদায় জাকাত প্রদানে গড়িমসি করছিলো। তখন হযরত আবু বকর রা. বলেছিলেন, রাসূল সা. এর সময় যারা বকরি জাকাত দিয়েছিলো। এখন যদি তারা বকরির রশিটা দিতেও অস্বীকার করে, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো। বিষয়টি হলো রাষ্ট্র যদি তার দ্বায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে তাদের উচিৎ রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় করা। তবে এখানে আয়-ব্যায়ের স্বচ্ছতার বিষয়টি লক্ষ্য রাখতে হবে। তা না হলে লাভের চেয়ে ক্ষতির আশংকাই বেশী। এ জন্য দরকার কিছু পবিত্র মানুষ ও পবিত্র পরিবেশের। দেশের অর্থনীতিবিদ ও আলেমদের সমন্বয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র একটি জাকাত বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। যারা এনবিআরের মত কঠোরভাবে সঠিক হিসাব প্রণয়ন করে নাগরিকদের জাকাত আদায় করবে। এমনটি সম্ভব হলে দেশে ধনী গরীবের বৈষম্য তো হ্রাস পাবে। সামাজিক শৃংখলা ও দারিদ্র্যতা বিমোচনে তা ব্যাপক ভুমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।


আধুনিক অর্থনীতির এ সময়ে জাকাতের এ সব খাত সম্পর্কে আমাদের মুফতিদের সচেতন হতে হবে। না হয় আধুনিক অর্থনীতিকেন্দ্রীক যাদের লেনদেন ও জীবনযাপন, তাদের জাকাতের হিসাব সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হবে না।


প্রশ্ন :  আপনার মুসল্লীদের কিভাবে জাকাত প্রদানে আপনি দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন?
উত্তর : জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। তাই জাকাত আদায়ের গুরুত্ব ও এর খাত সমূহ সম্পর্কে তো আলোচনা করি, তবে যে বিষয়টির প্রতি আমি বেশী গুরুত্বারোপ করি, সেটি হলো জাকাতের হিসাব। কারণ সঠিক হিসেব না করে আন্দাজের ওপরে জাকাত দিলে তা পরিপূর্ণরুপে আদায় হবেনা। আর এখনকার বাস্তবতায় জাকাতের অনেক ধরন রয়েছে। যেমন ব্যক্তিগত জাকাত,ব্যবসায়িক জাকাত, প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত, শেয়ারের জাকাত ইত্যাদি। শুধু সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ ও সাড়ে বায়ন্ন তোলা রুপার হিসেব দিয়ে এখন চলবে না। আধুনিক অর্থনীতির এ সময়ে জাকাতের এ সব খাত সম্পর্কে আমাদের মুফতিদের সচেতন হতে হবে। না হয় আধুনিক অর্থনীতিকেন্দ্রীক যাদের লেনদেন ও জীবনযাপন, তাদের জাকাতের হিসাব সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হবে না। তাই এ বিষয়টি আমি বেশী গুরুত্বারোপ করি। আর বিতরণের ক্ষেত্রে আমি বলি, গদবাধা শাড়ী লুঙ্গি বিতরণের চেয়ে জাকাতগ্রহীতাদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করতে। যেমন কোন গরীব ছেলেকে আইসিটি কোর্স বা কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থার করলে সে আর আগামী বছর জাকাত নিতে আসবে না। বা কাউকে সামান্য পুজির ব্যবস্থা করলে সে ছোট কোন ব্যাবসা করলো। এভাবে জাকাতপ্রার্থীদের স্বাবলম্বী করার ব্যাপারে আমি মুসল্লিদের উৎসাহিত করি।

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com