রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:১৪ অপরাহ্ন

ছোট উদ্যোগই একদিন বড় হয় | মিজানুর রহমান কিরণ

ছোট উদ্যোগই একদিন বড় হয় | মিজানুর রহমান কিরণ

মিজানুর রহমান কিরণ। মানবসেবায় নিয়োজিত এক তরুণের নাম। জন্ম নওগাঁ জেলায়। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। জাবির ২০০৮ সালে শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (পিডিএফ) নামক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। তখন থেকেই এই সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। এই সংগঠনের উদ্যোক্তা হিসেবে সম্প্রতি তিনি ফোর্বস সাময়িকী প্রকাশিত এশিয়ার অনুর্ধ্ব ৩০ সামাজিক উদ্যোক্তার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। মিজানুর রহমান কিরণ কথা বলেছেন সংগঠনের বর্তমান, ভবিষ্যৎসহ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি তহিদুল ইসলাম

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সমায়িকী ফোর্বস এশিয়ার অনুর্ধ ৩০ সামাজিক উদ্যোক্তার নাম প্রকাশ করেছে। তাদের প্রকাশ করা সেরা ৩০ উদ্যোক্তার আপনি একজন। জনপ্রিয় এই সাময়িকীতে নিজের নাম দেখে কেমন লেগেছে?

ডেফিনেটলি, দেখে ভাল লেগেছে। তবে আগে ভালবাসা নিয়ে কাজ করতাম এখন দায়িত্ববোধটা আরও বেড়ে গেছে।

আপনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় ২০০৮ সালে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (পিডিএফ) নামক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। একজন শিক্ষার্থী হয়ে অন্য (প্রতিবন্ধী) শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করার চিন্তা কিভাবে আসলো?

আগে থেকে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম (উদাহরণ স্বরূপ কয়েকটি সংগঠনের নাম বলেন)। ২০০৮ সালে আমার এক ছোট ভাই যার ডিজএবিলিটি ছিল, সে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। ওকে আমি হেল্প করতাম। ওকে হেল্প করতে গিয়ে ওর মাধ্যমে ড. ভেলরি অ্যান টেলরের (সাভারে পক্ষাঘাতগ্রস্থদের পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন) সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ওনার জীবনীতে দেখলাম যে, উনি অনেক বড় সেক্রিফায়েস করে বাংলাদেশে এ ধরণের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এটা আমাকে অনেক বেশি নাড়া দেয়। একজন বিদেশি মানুষ বাংলাদেশিদের জন্য কাজ করছে কিন্তু আমরা তো তেমন কিছু করছি না। আমাদের উচিৎ এই জায়গায় কাজ করা। তো ওইখান থেকেই শুরু মূলত।

এমন সামাজিক উদ্যোগ নেয়ার পেছনে কারোর অনুপ্রেরণা ছিল কী?

হ্যাঁ, ডেফিনেটলি। ভেলরি ছিলেন আমার অনুপ্রেরণা। কারণ, ওনাকে দেখেই তো আমরা কাজ শিখেছি এবং ওনার কাছ থেকেই সার্ভিসটা পেয়েছি—এ কাজটা করতে ভয় পাওয়ার কোন সুযোগ নেয়, থামার কোন সুযোগ নেয়।


আমরা একটা ইনস্টিটিউশন করতে যাচ্ছি। যে ইনস্টিটিউশন মূলত একুশ শতকের স্কিলগুলো প্রতিবন্ধী ভাই-বোনদেরকে দেব। এটা একটা গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রাম হবে, ৬ মাসব্যাপী ট্রেনিং হবে সেখানে। ট্রেনিংগুলো নেয়ার মাধ্যমে যেকোন কমপ্লিকেটেড জবের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে পারবে তারা


প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে পিডিএফ কতটুকু সফল?

সফলতা বিষয়টা তো আপেক্ষিক। এটার কোন শেষ নেয়। কারণ, আমাদের সমাজটা একেবারেই প্রতিবন্ধীবান্ধব না। তো সেদিক দিয়ে আমরা মনে করি কিছু কাজ তথা কিছু কাজের সফলতা আমাদেরকে সব সময় অনুপ্রাণিত করে। তার মধ্যে একটা হলো—আমরা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভাল পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (ঢাকা) গিয়ে প্রতিবন্ধীদের সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে পেরেছি। অন্তত আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি আমাদের টার্গেট ছিল যে, ইয়াং জেনারেশানকে প্রতিবন্ধীবান্ধব মানসিকতা সম্পন্ন করে তোলা। সেই জায়গায় আমরা ভালভাবে সফল।

আপনার হাতেগড়া সংগঠনটি বর্তমানে বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠন নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আমরা শুরুতে যখন কাজ করতাম তখন শুধু সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করতাম যাতে তরুণ সমাজ আমাদের প্রতিবন্ধী ভাইবোনদের জন্য পজিটিভ থাকে এবং তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করে। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে আমরা দেখলাম—আরও দুটো চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে রয়ে গেছে। একটা হলো—পলিসিগত কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসা দরকার এবং একটা পর্যায়ে (২০১০ সালে) উপলব্ধি করি যে, প্রতিবন্ধীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা নাই কেন সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে। তো সেখানেও একটা ভাল পরিবর্তন আসে ২০১৩ সালে, আমাদের সুরক্ষা আইন হয়। এই মুহূর্তে পিডিএফ যেটা মনে করছে সেটা হলো—আমাদের একটা পলিসি আসছে, মানুষের মাঝেও পরিবর্তন এসেছে কিন্তু যাদের ডিজএবিলিটি আছে তাদের অনেক যোগ্যতা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির দরকার তাহলে সামনে তাদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেজন্য আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে—আমরা একটা ইনস্টিটিউশন করতে যাচ্ছি। যে ইনস্টিটিউশন মূলত একুশ শতকের স্কিলগুলো প্রতিবন্ধী ভাই-বোনদেরকে দেব। এটা একটা গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রাম হবে, ৬ মাসব্যাপী ট্রেনিং হবে সেখানে। যে ট্রেনিংগুলো নেয়ার মাধ্যমে যেকোন কমপ্লিকেটেড জবের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে যোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতে পারবে তারা। পাশাপাশি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠবে সবাই।

যারা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে চায় তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

যেকোন ভাল কাজই হচ্ছে সমাজের জন্য একটা কনট্রিবিউশন। প্রত্যেকটা মানুষের উচিৎ এ ধরণের মানসিকতাকে লালন করা। যারা নতুন, যারা কাজ করতে চায় তারা যদি কাজটার সঙ্গে ভালবাসাকে সম্পৃক্ত করতে পারে তাহলে তারা অনেক বড় কিছু পাবে যেটা তারা প্রত্যাশা করে না। আমাদের সমাজে এই মুহূর্তে অনেক ভাল ভাল উদ্যোগের দরকার। কারণ, সমাজে এখন অনেক সংকট দেখা দিচ্ছে। নতুনদের প্রতি এটাই বলবো, কাজের প্রতি ভালবাসা নিয়ে এগিয়ে আসাটা সময়ের দাবি।

প্রতিদিনের সংবাদের তরুণ পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন

যে তরুণরা মনে করে—আমরা অনেক ছোট, আমরা এখন আর কি করতে পারবো। কিন্তু আমরা যেটা দেখি যে, সবগুলো ছোট মানুষ মিলিয়ে, সবগুলো ছোট ছোট মানুষের ছোট ছোট উদ্যোগ মিলিয়ে বড় কিছু হবে। আমাদের এখান থেকে যদি এতটুকু কারো অনুপ্রেরণা তৈরি হয় তাহলে সে তার জায়গা থেকে ঠিক ততটুকু একটা কাজ শুরু করুক যেটা একসময় আমাদের সমাজ পরিবর্তনের জন্য একটা সম্মিলিত বড় শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে।

সম্পাদনা : মীর হেলাল

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com