শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ন

চিন্তার নায়ক জসিম নদভী

চিন্তার নায়ক জসিম নদভী

চিন্তার নায়ক জসিম নদভী

সগীর আহমদ চৌধুরী : ১. ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন। সেই দিনই (১৪ মার্চ ২০১৯) তো ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন হাটহাজারী সাংগঠনিক জেলা আয়োজিত মুসলিম উম্মাহর বিপর্যয়: কারণ ও প্রতিকার শীর্ষক সেমিনারে আপনার সঙ্গে দেখা হলো। কতোটি বন্ধুবৎসল ছিলেন আপনি, দেখা হতেই বললেন, চিটাংয়ুত্তুন আইবার সময় আঁরে উদ্দা লই ন আইয়ন দে? (চট্টগ্রাম শহর থেকে আসার সময় আমাকে সঙ্গে নিয়ে আসেননি যে?) কে জানতো এটিই হবে আপনার সাথে আমার শেষ কথা!

আজ আমি বড়ই দুঃখিত এই ভেবে যে, সেদিন আমি প্রোগ্রামে শেষ পর্যন্ত থাকিনি, আপনার অতিমূল্যবান বক্তব্য শোনার সৌভাগ্য আমার হয়নি, আপনার গাড়িতে করে চট্টগ্রাম শহর পর্যন্ত আসার মাধ্যমে আপনার সান্নিধ্য লাভের শেষ সুযোগটি হাতছাড়া করেছি বলে।

২. শায়খ জসিম উদ্দীন নদভী। কওমির গর্বিত সন্তান, একজন আলেমে দীন, নদওয়াতুল উলামার সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, সবে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দীনী দাওয়াত বিষয়ে পিএইচ-ডি করেছেন। তাঁর ভাষায় এটি তাঁর নবজীবনের শুরু ছিল। তাঁর বিশাল স্বপ্ন ছিল, শিক্ষা-সমাজ ও রাজনীতি এই প্রধান তিনটি ব্যাপারে। জামিয়া দারুল মাআরিফকে নিয়ে তিনি স্বপ্ন বুনতেন, এটিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবেন, আলমি পর্যায়ে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছাবেন, শিক্ষার মান ও অবকাঠামোয় সত্যিকার অর্থে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করবেন তাকে। তাঁর দ্বিতীয় স্বপ্ন ছিল সমাজকে ঘিরে, সাধারণ মানুষকে নিয়ে বিশেষত কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া)-এর জনগণকে নিয়ে।

৩. তিনি সবকিছু গুছিয়ে এনেছিলেন। তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ আলেম ও বিশ্ববরেণ্য আলেমে দীন শায়খ আল্লামা সুলতান যওক নদভী হাফিযাহুল্লাহর জামাতা ছিলেন। জামিয়া দারুল মাআরিফ আল-ইসলামিয়ার নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। শায়খ ড. ইউসুফ আল-কারযাবীর নেতৃত্বাধীন বিশ্ব ওলামা কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামি অঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেছিলেন, ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। সবমিলিয়ে সবকিছু গুছিয়ে এনেছিলেন তিনি, এবার বাংলাদেশে তিনি তাঁর স্বপ্নগুলো পূরণের পর্ব, শুরু করেছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন উদ্যমী, উদ্যোগী, পরিশ্রমী, ব্যস্ত, ধৈর্যশীল, কর্মঠ ও আদর্শবাদী একজন মানুষ। অহংকার তাঁর চরিত্রে ছিল না, মিশতেন সবার সঙ্গে, হাসি তাঁর ঠোটে লেগে থাকতো।

৪. তিনি রাজনীতি করতেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গত সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছিলেন। ইসলামী আন্দোলন সমর্থিত জাতীয় ওলামা-মাশায়েখ ও আইয়িম্মা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এবং চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি ছিলেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারণায় দু’দিন আমিও শরীক হয়েছিলাম, মহেশখালীর কোনো গ্রাম-পাড়া-মহল্লা সম্ভবত বাকি ছিল না যেখানে তাঁর পা পড়েনি, এমন কোনো পুরুষ লোক হয়তো ছিল না যার সাথে তিনি অনন্ত একবার হলেও হাত মেলাননি। এমন কোনো শিশু-নারী ছিল না যারা তাঁকে দেখেননি বা তাঁর কথা শোনেনি। পুরো নির্বাচনী সময়টা তিন রাত-দিন এক করে মেহনত করেছিলেন।

৫. তিনি স্বপ্ন দেখতেন সংসদে একজন আলেম হিসেবে প্রতিনিধিত্বের, তিনি সংসদে একজন নায়েবে নবী হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আত্মমর্যাদার সঙ্গে লড়াই করার এবং আলেম হায়সিয়তের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে সংসদ নির্বাচনে স্বচ্ছভাবে বিজয় লাভের। তাঁর মধ্যে সেই আত্মমর্যাদা পূর্ণ বজায় ছিল, অন্য অনেকের মতো আওয়ামী-বিএনপির মতো রাজনীতির পেছনে দৌড়াননি তিনি। বরং তিনি এজন্য বেঁচে নিয়েছিলেন তাঁর মতে একটি আদর্শবাদী ইসলামি দলকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে। দল হিসেবে ইসলামী আন্দোলনকে বেঁচে নেওয়ায় অনেক বন্ধু-বান্ধবের অনেক খোচাখুচিরও শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। তিনি সয়ে নিয়েছেন, ভদ্র-শান্ত ও শিষ্টের সঙ্গে জবাব দিয়েছেন কিংবা বুঝিয়েছন এবং ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে গলত ধারণা, বদযন ও ভ্রান্তিকর অপবাদগুলোর অপনোদন করেছেন। রাজনীতির পুরোটি সময় তিনি দলের প্রতি একান্তই অনুগত ছিলেন, তিনি বিশ্বস্ত ছিলেন দলের নীতি-আদর্শের প্রতি, দলের আমীর মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই)-এর সঙ্গে ভালবাসার সম্পর্ক ছিল, তিনি পীর সাহেবকে আমীর হিসেবে সম্মান করতেন, শ্রদ্ধা করতেন এবং অত্যন্ত মুহাব্বত করতেন। শায়খ জসিম নদভী (রহ.) ইসলামী আন্দোলনের জন্য বড়ই এক নেয়ামত ছিলেন, বেশ বড় অ্যাসেট ছিল ইসলামী আন্দোলনের। তাঁর ইন্তিকালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশই সবচেয়ে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হলো।
লেখক : রাজনীতিক ও সমাজ বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com