শনিবার, ১১ Jul ২০২০, ০৯:০৮ অপরাহ্ন

কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন কেনো?

কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন কেনো?

কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন কেনো?

আব্দুল কাদির চৌধুরী বাবুল :: বিখ্যাত জার্মান শিক্ষাবিদ ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবল এর শিশুশিক্ষার ধারনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এই কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। ফ্রোয়েবল আজ থেকে দুইশত বৎসর পূর্বে ১৮৩৭ সালে এই শিক্ষা ব্যবস্থার ধারনা দিয়ে ছিলেন। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থার এই ধারনা বিশ্বের অনেক দেশেরমতো আমাদের দেশেও আশির দশকে চড়িয়ে পড়ে।

এ শিক্ষার উদ্দেশ্য গতানুগতিক শিক্ষার বাহিরে একটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা। শিশুরা সাধারণত ৬+ বছর বয়সে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতো। বাস্তবে একটি শিশুর চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যেই প্রায় ৮০% ব্রেন ডেভেলপ হয়ে পড়ে। শিশুর শেখার বয়স তখন থেকেই শুরু হয়ে যায়। বিষয়টি শিক্ষাবিদগণ দীর্ঘদিন পর বুঝতে পেরে বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিন্ডাগার্টেনের মতো প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেছেন।

জার্মান শিক্ষাবিদ ফ্রোয়েবলের ধারনামতে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুরা কিন্ডারগার্টেনে উপস্থিত হয়ে পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা করাসহ একে-অপরের সাথে খেলাধূলা করবে এবং অন্যের সাথে স্বাচ্ছন্দ্যে উপযুক্ত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করবে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকগণ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণগুলোর বাস্তবমূখী কলা-কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে শিশুর মনোযোগ আকর্ষণ করবেন। উপযুক্ত ভাষা ও শব্দ ভাণ্ডার প্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে পড়তে উদ্বুদ্ধ করবেন। গণিত, বিজ্ঞানসহ সঙ্গীত, কলা, সামাজিক আচার-আচরণ শেখানোর উদ্দেশ্যে এ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন ঘটান।

সাধারণত শিশুরা তাদের অধিকাংশ সময় বাড়ীতেই অতিবাহিত করে। কিন্ডারগার্টেনে প্রবেশের পর পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের রক্ষণাবেক্ষণ, প্রতিপালন, নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি যাবতীয় ব্যবস্থাপনা কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে থাকেন। সাহায্য- সহযোগিতার দ্বার প্রশস্ত করে পরিবেশের সাথে শিশুকে খাঁপ খাওয়ানোর মাধ্যমে পিতা-মাতা বা অভিভাবককে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে রক্ষা করেন।

খেলাধূলা এবং পারস্পরিক ক্রিয়া বা যোগাযোগের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে সমজাতীয় শিশুদের মিলনক্ষেত্র হিসেবে একটি সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে উঠে এই সব কিন্ডারগার্টেনে।

কিন্তু ফ্রেডরিখ ফ্রোয়েবলের ধারণা নিয়ে আমাদের দেশে কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠিত হলেও যৎসামান্য প্রতিষ্ঠান হয়তো এই ধারণাকে লালন করছে। সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে পূঁজি করে সারাদেশের আনাচে কানাচে কিছু কিছু কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের শিক্ষাদান করছে, বা তাদের ভিশন কী তা অনেকেরই বোধগম্য নয়।

তবে এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, দেশে লক্ষাধিক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বা মানসম্মত কিন্ডারগার্টেন পরিচালিত হচ্ছে। এতে কোটি কোটি শিশু শিক্ষাগ্রহণ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ উচ্চ শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতী শিক্ষাদানে ব্রতী রয়েছেন। তবে এ সকল প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও বাংলাদেশ সরকারের সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষাকে তরান্বিত করতে মানসম্মত কিন্ডারগার্টেনগুলোর ভূমিকা কোনভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকার কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা ব্যবস্থাকে ৬নং ক্যাটাগরিতে ২০০৯ সাল হতে প্রাথমিকেরমতো বই পাওয়ার ও সমাপনী পরীক্ষা দেওয়ার স্বীকৃতি দিয়েছে।

মানসম্মত কিন্ডারগার্টেন প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত নীতি, শিক্ষার আদর্শগত পরিবেশ, নিয়মনীতি, কো-কারিকুলাম, শৃঙ্খলার মাধ্যমে যে শিক্ষাদান করে যাচ্ছে—- তার কোনো ব্যবস্থাই অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই কিংম্বা অনুপস্থিত। সরকারি শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত কিম্বা আনুপাতিক হারে শিক্ষকের অভাব আজও বিদ্যমান। এসব পরিস্থিতির কারণে মানসম্মত প্রাইভেট শিশুশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সচেতন অভিভাবকের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

কিন্ডারগার্টেনগুলোর আত্মত্যাগী শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শিশুদের বাস্তবমুখী শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। সহশিক্ষা কার্যক্রমও বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রতিযোগিতায় ঠিকে থাকারমতো জ্ঞান অর্জন হচ্ছে। ফলাফলের দিক দিয়ে মানসম্মত কিন্ডারগার্টেনগুলো সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। সরকার বাধ্য হচ্ছে কিন্ডাগার্টেন ব্যবস্থাপনাকে লক্ষ্য করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও প্রাক-প্রাথমিক ক্লাস চালু করতে।

আমি কোনো অবস্থায়ই বাণিজ্যিক শিক্ষা কিম্বা অর্থহীন কোনো শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে নই। সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার বৃহৎ এজেন্ডা বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি মানসম্মত কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাকে কোনভাবেই অস্বীকার করতেও পারছি না। মূলত: কিন্ডাগার্টেন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্পূরক হয়ে কাজ করছে। যে যেভাবেই আলোচনা বা সমালোচনা করুক। এক একটি কিন্ডাগার্টেন বা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে বলেই উচ্চ শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীদের জন্য সম্মানজনক পরিবেশে নিজের বেকারত্ব নিবারণ করার সুযোগ হয়েছে।

তবে কথা হলো, প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের শিক্ষা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারছে কি না? বিদ্যালয়ে মানসম্মত পরিবেশ আছে কি না? পর্যাপ্ত খেলার মাঠ আছে কি না? ক্লাসরুমে পর্যাপ্ত আলো বাতাসের সুব্যবস্থা আছে কি না? সুপিয় পানি, মানসম্মত টয়লেট ও ওয়াসরুম আছে কি না? মানসম্মত ব্যবস্থাপনা ও উপযুক্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে পারছে কি না?

প্রকৃত অর্থে একটি কিন্ডাগার্টেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানে, সকল সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন আধুনিক ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে।

লেখক : প্রধান শিক্ষক, নিউ ভিশন কেজি এন্ড হাই স্কুল, বাহুবল, হবিগঞ্জ।

kadirchy@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com