বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন

কাঁদো, ময়মনসিংহবাসী কাঁদো

কাঁদো, ময়মনসিংহবাসী কাঁদো

স্মরণ । মুজীব রহমান

কাঁদো, ময়মনসিংহবাসী কাঁদো

আজ ময়মনসিংহবাসীর জন্য বড়ই মর্মান্তিক একটা দিন। এতগুলো মানুষের শোক আমরা কীভাবে সহ্য করব মাবুদ! প্রথমে জানতে পারলাম ট্রলার ডুবিতে ১৭ জনের মৃত্যু। খুব কষ্ট লেগেছিল।পরে যখন বিস্তারিত জানতে পারলাম।নিজেকে আর সংবরণ করে রাখতে পারলাম না।

১৭ জনের অধীকাংশের বাড়ি ময়মনসিংহের চর কোনাপাড়ায়।সবাই মাদরাসার ছাত্র ও শিক্ষক। আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগছে হাফেজ মাহফুজ ভাই এর জন্য। ময়মনসিংহের চরাঞ্চলসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহে মেয়ে হাফেজা তৈরীর পেছনে তার অবদান ছিল সর্বাগ্রে। সারা বাংলাদেশেই তাঁর হাতে গড়া কয়েকশ হাফেজা রয়েছে।

গত ২০১৯ এর রমজানে হাফেজ মাহফুজ ভাই এ-র সাথে আমার পরিচয় হয়।

খুবই মিষ্টভাষী,মেধাবী, প্রতিভাবান ও স্বপ্নবাজ মানুষ ছিলেন তিনি।তিনি প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে নিজ হাতে গড়ে তুলে ছিলেন দুটি মানসম্মত হিফজ খানা।একটি বালকদের আরেকটি বালিকাদের জন্য।

তার হাতে গড়া মেয়ে হাফেজাই ছিল প্রায়ই দুইশত। তিনি অভিনব এক সিস্টেমে মেয়েদের হাফেজা বানাতেন। তিনি মেয়েদের আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থাকে পছন্দ করতেন না। তাই তিনি তার প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন এক পদ্ধতিতে মেয়েদের হাফেজ বানাতেন।প্রতিদিন সকাল বেলা মেয়েরা বাড়ি থেকে চলে আসত মাদ্রাসায়। দশটা পর্যন্ত পড়ে চলে যেত বাসায়। আবার দুপুরের পর এসে বিকেল পর্যন্ত পড়ে চলে যেত বাসায়।

মাহফুজ ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। এভাবে কি হাফেজা হওয়া সম্ভব? তিনি খানিকটা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন। মুজীব ভাই, অবশ্যই সম্ভব।শুধু মুখে বলেই নয়, আমি প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছি।

আপনার মত প্রথমে অনেকেই আমাকে এমন প্রশ্ন করত। বিরোধিতাও করত অনেকে। এখন তাওরাও এমন পরিকল্পনার চেষ্টা করছে।

মাহফুজ ভাই সেদিন আরো বলেছিলেন, সারাবাংলাদেশ থেকেই অসংখ্য মানুষ যোগাযোগ করে তাদের মেয়েদেরকে ভর্তি করার জন্য। আমি সাফ না করে দেই।আমার এখানে আবাসিক ব্যবস্থা নেই। তিনি বলেছিলেন,পুরোনো সিস্টেমের বাহিরে কিছু করতে গেলেই বাধা আসে। তবে একবার নিজের কাজকে প্রমান করতে পারলে আর কোন সমস্যা নেই। তিনি সেদিন খুব আফসোস করে বলেছিলেন, সারাদেশেই মানুষ এখন মেয়েদেরকে হাফেজা বানাতে চাচ্ছে কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ অভিভাবকরা পাচ্ছে না।

কী পরিমাণ চাহিদা অভিভাবকদের এ চরাঞ্চলের দিকে লক্ষ করলেই বুঝা যায়।চরের আমার এ ছোট্ট প্রতিষ্ঠানেই দেড় শতাধিক ছাত্রী আসে কুরআনের হাফেজা হতে।তাহলে বুঝেন মেয়েদের হাফেজা বানাতে অভিভাবকরা কতটা আগ্রহী?

একদিন তার কুরআনের বাগানে গিয়েছিলাম।তিনি শুধু তার ছাত্র ছাত্রীদের শিক্ষকই ছিলেন না।সকলের কাছে তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। তিনি শুধু তাদেরকে কুরআন পড়াতেন না। জীবনও শিক্ষা দিতেন।

সেদিন তার সাথে নানাবিষয়ে অনেক কথাই হয়।কিভাবে এতগুলো মেয়েদের হাফেজ বানালেন? কী কী বাধার সম্মুখিন হয়েছেন ইত্যাদি বিষয়ে দীর্ঘ কথা বলেছিলাম আলোকিত বাংলাদেশের জন্য একটি ফিচার তৈরীর জন্য। ফিচারটি তৈরী করব করব করে আর হয়ে উঠেনি!

তিনি একজন হাফেজ হলেও আমার কাছে একজন চিন্তাশীল মানুষও মনে হয়েছে তাঁকে।

হিফজ শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তার নিজস্ব একটি অলিখিত সিলেবাস ছিল।ছিল কুরআনের আলোকে প্রতিটি ঘরে পৌছে দেয়ার নির্দিষ্ট পরিকল্পনাও।

সেই রমজানের আমরা তার এলাকায় শায়েখ Ahmadullah পরিচালিত আসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জরুরী ইফতার সামগ্রী বিতরণ করেছিলাম।শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি তার ছাত্রদেরকে সাথে নিয়ে আমাদেরকে সহযোগিতা করেছিলেন।
তার ছোট ছোট দুটি ছেলে সন্তান ছিল। বড় ছেলেটার কুরআন তেলাওয়াত ছিল খুবই চমৎকার।

আজ নেত্রকোনার ট্রলার ডুবিতে বাবার সাথে দু’সন্তানও উড়াল দিয়ে চলে গেল তাদের রবের কাছে। তাদের আম্মু মাহফুজ ভাই এর স্ত্রী এতো শোক কীভাবে সহ্য করবে মাবুদ!

প্রিয় ময়মনসিংহবাসী! এ শোক শুধু মাহফুজ ভাইর স্ত্রীর নয়, কিংবা ১৭ শহীদের পরিবারেরও নয়। এ শোক পুরো ময়মনসিংহবাসীর।

প্রিয় ময়মনসিংহবাসী! আজ তোমাদের কাঁদার দিন। কাঁদো রবের দরবারে দু’হাত তুলে। মাহফুজ ভাইসহ আজকের সকল শহীদ পরিবারকে আল্লাহ ধৈর্য ধরার তৌফিক দিন।

লেখক : সাথী, শিকড় সাহিত্য মাহফিল

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com