সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন

করোনাকালে বায়তুল্লাহ সফর

করোনাকালে বায়তুল্লাহ সফর

করোনাকালে বায়তুল্লাহ সফর

আমিনুল ইসলাম কাসেমী

দুই বছর ধরে হজ বন্ধ। ওমরা বন্ধ দেড় বছর। এই সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের বাইরের কোন হজ-ওমরাপালনকারী মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করেনি। আলহামদুলিল্লাহ, বিগত ১০ আগস্ট থেকে সৌদি সরকার ওমরার অনুমতি দিয়েছে। সারা বিশ্বের মুসলিমদের মাঝে আনন্দের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। কেননা, বায়তুল্লাহপ্রেমীদের অন্তর ছটফট করছিল। ইচ্ছে থাকলেও সেখানে কেউ যেতে পারেনি। এখন অনুমতি পাওয়ায় প্রতিটি মুসলমান যেন খুশি প্রকাশ করছে।

তবে এই করোনাকালে কীভাবে বায়তুল্লাহ-তে যাবে। সেখানে কীভাবে ওমরা এবং হজ পালন করবে। এটা নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয় কাজ করছে। অনেক হাজি সাহেব দ্বিধা-দন্ধে পড়েছেন, সেখানে গিয়ে এই মুর্হুতে কী সব কিছু করা সম্ভব।
আসলে করোনাকালে বায়তুল্লাহ সফর করা অসম্ভব কিছু নয়। বরং খুবই সুন্দর ভাবে সব কিছু করা যাবে। শুধু আমাদের কিছু কিছু বিষয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে।

ইহরাম অবস্থায় মাস্ক ব্যবহার করা যাবে : অনেকেই ইহরাম অবস্থায় মাস্ক পরা নিয়ে চিন্তিত। ইহরাম এর সময় তো মুখ খোলা রাখতে হয়। কিন্তু করোনাকালে তো সরকার মাস্ক পরা বাধ্যতামুলক করেছে। তাহলে হজ-ওমরাকারীগণ কী ইহরাম অবস্থায় মাস্ক পরতে পারবেন?

করোনাকালে ইহরাম অবস্থায় মাস্ক পরতে পারবে। এব্যাপারে ওলামায়েকেরাম জায়েজ বলেছেন। তাছাড়া মাস্ক পুরো মুখ ঢেকে দেয় না।মুখের কিছু অংশ ঢেকে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ইহরাম অবস্থায় মাস্ক পরা যাবে।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা যাবে : ইহরাম অবস্থায় প্রয়োজনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার কতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে সুগন্ধিযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবেন। বাজারে সুগন্ধিছাড়া হ্যান্ড স্যানিটাইজার পাওয়া যায়। প্রয়োজনে সেগুলো কিনে সাথে রাখতে পারেন। সফরে সেগুলো ব্যবহার করা যাবে।

নিয়্যাতকে পরিশুদ্ধ করুন : যে কোন নেক কাজ করার পুর্বে নিয়্যাতকে শুদ্ধ করতে হয়। নিয়্যাত যদি খালেছ হয় তাহলে তার পরিপূর্ণ সওয়াব পাওয়া যায়। ঠিক ওমরা এবং হজ এগুলো তো বড় নেকীর কাজ।সুতরাং এর জন্য নিয়্যাতকে আগে পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে। আমার হজ- ওমরা হবে আল্লাহর সšষ্টির জন্য। দুনিয়াবী কোন উদ্দেশে নয়। লৌকিকতা উদ্দেশ্যে নয়। আজকাল অনেকের নিয়্যাত থাকে, আমি এলাকার বড় ধনী মানুষ, আমার অনেক সম্পদ আছে, সুতরাং আমি যদি হজ বা ওমরা করতে না যাই, লোকেরা খারাপ মনে করবে। কেউ কৃপণ ভাবতে পারে। এরকম চিন্তা অনেকের ভিতরে কাজ করে। আবার অনেকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার উদ্দেশে হজ- ওমরা সফর করেন। হজ করে আসলে মানুষ আমাকে হাজি বলবে, ইলেকশনে আমার প্রতি মানুষের ভাল ধারনা জন্মাবে। ইত্যাকার বিষয়ের চিন্তা-চেতনা তার মাঝে কাজ করে থাকে। এজন্য প্রত্যেক ওমরাপালনকারী এবং হজপালনকারীদের বিশুদ্ধ নিয়্যাত জরুরি।

সৌদি আরবের কোন ব্যবস্থাপনার শেকায়েত করা যাবে না : প্রত্যেক হজ-ওমরাপালনকারী আল্লাহর মেহমান। আর মেজবান হলেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। আল্লাহ তায়ালা নিজেই এই মেহমানদারীর ব্যবস্থা করেন।। তিনি কোন বান্দার মাধ্যমে এই কাজের ইন্তেজাম করে থাকেন। সুতরাং ওমরা বা হজের সফরে গিয়ে কোন ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে শেকায়েত করা বাঞ্চনীয় নয়। কেউ যদি ওখানকার কোন ব্যবস্থাপনার শেকায়েত করেন, তাহলে বোঝা যাবে , সে আল্লাহ তায়ালার মেহমানদারীতে সšষ্ট নয়। এজন্য সাবধান হতে হবে। কোন অবস্থাতে সফরে গিয়ে কোন ধরনের ব্যবস্থাপনার প্রতি প্রশ্ন তোলা ঈমানদার মানুষের কাজ নয়।
মনে রাখবেন, প্রায় দুটো বছর ওমরা এবং হজ বন্ধ। আল্লাহতায়ালা দয়া করে আমাদের জন্য আবার খুলে দিয়েছেন। সুতরাং কোন ব্যবস্থাপনাকে খারাপ বলে না শুকরিয়া করবেন না। আল্লাহ তায়ালা অসšষ্ট হলে আবার তিনি এ নেয়ামত ছিনিয়ে নিতে পারেন।

মন-মানসিকতা থাকবে শুধু আল্লাহর ঘরে পৌছানো দরকার : সকল হাজি সাহেবদের এমন মন-মানসিকতা থাকবে। আমার বায়তুল্লাহ-তে পৌছানোর দরকার। শুধু কোন রকম মক্কা এবং মদীনায় গিয়ে যেন পৌছাতে পারি। এরকম প্রেম-ভালবাসা থাকা দরকার। শুধু উপযুক্ত পরিবেশ ,অনুকুল পরিবেশ তালাশ করলে হবেনা। যে আসল প্রেমিক সে কখনো উপযুক্ত পরিবেশ খোঁজে না। বরং খাঁটি প্রেমিকের চিন্তা থাকবে কীভাবে প্রেমাস্থúাদের কাছে যাওয়া যায়। তাই সকল হজ-ওমরা পালনকারীদের এরকম ইরাদা করতে হবে। আমি শুধু মক্কা এবং মদীনায় পৌছাতে চাই। আল্লাহ তায়ালার ঘরের কাছে যেতে যাই। তাঁর ঘর সামনে নিয়ে শুধু বসে থাকব। সেখানে গিয়ে প্রাণ খুলে দুআ-মুনাজাত করব। এমনিভাবে মদীনায় পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে চাই। সেখানে গিয়ে হাবীবের শানে দুরুদ সালাম পেশ করতে চাই। এরপর আল্লাহ তায়ালা আমাকে যা ইবাদত করার তওফিক দেন সেটা করব। তিনি আমাদের যেভাবে রাখেন সেভাবে থাকব। তিনি আমাদের যা রিজিক রাখেন তাই খাব। তবুও মক্কা-মদীনায় যাওয়ার ব্যাপারে কোন গাফলতি করবনা।

গীবত-শেকায়েতের মজলিস পরিহার করুন : হজ-ওমরার সফরে গিয়ে ইদানিং কিছু হাজি সাহেব হোটেলে এবং হারাম শরীফে গীবত-শেকায়েতের মজলিস সৃষ্টি করেন। কে কত টাকা দিয়ে হজ-ওমরায় এসেছে। কার কোম্পানী কী রকম সার্ভিস দিচ্ছে। এসব আলোচনা-সমালোচনায় জড়িয়ে পড়েন। দেখা যায়, মক্কার মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববীতে বসে হাজিরা এসব গল্প করে যাচ্ছে। শেষমেষ গল্প এর রেশ গিয়ে পড়ে কোম্পানীর উপর। তখন কোম্পানীর মোয়াল্লিম সাহেবের গীবত শেকায়েত করতে থাকে।এমনকি সৌদি আরবের মোয়াল্লেম এবং সেখানকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আর গীবতের মজলিস জমে যায়। যেটা বড় গোনাহের কাজ।

অথচ হাজি সাহেব তো গিয়েছেন গোনাহ মাফের জন্য। কিন্তু গীবত-শেকায়েতের মত গোনাহ-তে সে জড়িয়ে পড়ে। এজন্য প্রত্যেক হাজি সাহেবকে সতর্ক থাকতে হবে। এভাবে প্রত্যেক হাজি সাহেবকে তৈরী হতে হবে। মক্কা-মদীনায় যাওয়ার ইশক-মহব্বত পয়দা করতে হবে। এবং কিছু স্বাস্ব্য বিধি মেনে চললে সব কাজ সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক : মুহতামিম, নিজামিয়া মাদরাসা, গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com