মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:৩০ পূর্বাহ্ন

কওমিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চা হওয়া উচিত

কওমিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চা হওয়া উচিত

তানজিল আমির ● বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় সোনালি দিন হচ্ছে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর। রক্তনদী পেরিয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা সেদিন বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। সবুজশ্যামলিমার আকাশে সেদিন উঠেছিল বিজয়ের রক্তিম সূর্য। লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে পথচলা শুরু হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। এ সূর্য এখনও আলোড়িত করছে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক ও জনপদকে।

স্বাধীনতা শব্দটি প্রতিটি জীবের জন্মগত মৌলিক অধিকার। কিন্তু খোদাপ্রদত্ত এ মৌলিক অধিকারে অনেক সময় ক্ষমতায় উন্মত্ত কিছু মানুষ হস্তক্ষেপ করে। তখনই অপরিহার্য হয়ে ওঠে মুক্তি-সংগ্রামের। জানবাজি রেখে লড়াই করে পৃথিবীতে যারা অধিকার আদায় করে নিয়েছে, বাঙালি জাতি তাদের অন্যতম। স্বাধীনতার এ সংগ্রামে সেদিন কোনো বিভেদ ছিল না। ছিল না দল, মত বা ধর্মের কোনো বিভাজন। হাতে হাত ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির এ মহান লড়াইয়ে। বঙ্গবন্ধুর বজ্র কণ্ঠের গগনবিদারি সেই ঘোষণা, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। বাংলার মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ’। দৃঢ়প্রত্যয়ী সেই ‘ইনশাআল্লাহ’র প্রেরণাতেই হানাদারমুক্ত হয়েছে এ মাটি। মূলত মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির জীবন-সংগ্রাম ও বেঁচে থাকার অনন্ত প্রেরণা ও চেতনার মূল উৎস। খুলনা মাদানীনগর মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদিস মাওলানা ইমদাদুল্লাহ কাসেমী এ বিষয়ে বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধটা ছিল মূলত স্বাধিকার অর্জনের লড়াই। দেশ ও জাতির অধিকার রক্ষা ও নিজস্ব স্বপ্ন বাস্তবায়নে এ ছিল এক অবধারিত বাস্তবতা। অস্ত্রশস্ত্র ও কলাকৌশলে দুর্বল ও ছোট হওয়া সত্ত্বেও সময়ের প্রয়োজনে পুরো জাতি একতাবদ্ধ হয়েছিল মুক্তির এ সংগ্রামে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল যদিও ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের সংক্ষিপ্ত এ সময়টুকু। কিন্তু এর সূচনা হয়েছিল অনেক আগেই। সংগ্রাম ও লড়াইয়ের দীর্ঘ এক প্রক্রিয়ার শেষ অধ্যায় হল একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ। বিশেষত ১৯৪৭-এর ভারত বিভক্তি এটিকে অপরিহার্য করে তুলেছিল। ধর্মের মিথ্যা স্লোগানে গঠিত পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির আগাগোড়া ছিল ষড়যন্ত্র ও ভাঁওতাবাজিতে ভরা। তাই একাত্তরের এ সংগ্রাম যেমন নিজেদের অধিকার আদায়ের তেমনি ইংরেজদের সুবিধাভোগী শাসকগোষ্ঠীর প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। খুলনা দারুল উলুমের এ মুহতামিম মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর সঠিক ইতিহাসগুলো সবার জানা উচিত। বর্তমান প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস থেকে অনেক দূরে রয়েছে।

সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তাহীনতা ও মৌলিক অধিকারে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অবৈধ হস্তক্ষেপই সশস্ত্র একটি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। দিনাজপুরের বিখ্যাত ফয়জে আম মাদ্রসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আইয়ুব আনসারী মনে করেন, যখনই জুলুম নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়, মাজলুমদের মুক্তির আকাক্সক্ষাও তখন তীব্র হয়। একাত্তরের এ মহান সংগ্রাম ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মাজলুমানের লড়াই। জুলুমি শক্তির মোকাবেলায় বাঙালি ৭১-এ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল দৃঢ়ভাবে। এতে আমাদের ভৌগোলিক মুক্তি অর্জিত হয়েছে; কিন্তু নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ও চারিত্রিক অধঃপতনের কারণে আমরা যেন সেই আগের অবস্থানেই ফিরে গিয়েছি। যে সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্নে মুক্তিকামী জনতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার সংগ্রামে। তা এখনও অধরাই রয়ে গেছে। বরং নিত্যনতুন পন্থায় সমাজ আরও কলুষিত হয়েছে। তাই স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের সামাজিক সংস্কার খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য আলেম ওলামাসহ সমাজের দায়িত্বশীল সবার এ বিষয়টির প্রতি নজর দেয়া উচিত। কারণ নৈতিক অবক্ষয়ই পরাধীনতাকে টেনে আনে ও বরণ করে নেয়। তা ছাড়া ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণেও তিনি জনগণের সাংস্কৃতিক মুক্তির কথা বলেছেন। তাই এখানে প্রশ্ন রয়েই যায়, সাংস্কৃতিকভাবে মুক্তি আমরা কতটুকু অর্জন করেছি। সামাজিক সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার মহাসচিব মাওলানা আবদুর রহীম বলেন, আমাদের আলেমদের নেতৃত্বে ব্রিটিশবিরোধী যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, এর পরিসমাপ্তিই হল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। ১৮৩১ সালে বালাকোর্টে মুক্তির যে প্রেরণা নিয়ে শহীদ হয়েছিলেন সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) ও মুজাহিদীনরা। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৫৭ সালের আজাদী আন্দোলন, তারপর রেশমী রুমাল আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল শাইখুল হিন্দ (রহ.)-এর হাতে। তারপর হজরত শাইখুল হিন্দের সুযোগ্য উত্তরসূরি সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানীর আপসহীন সংগ্রামে ব্রিটিশ বেনিয়ামুক্ত হয়েছিল ভারতের মাটি; কিন্তু বাংলার মানুষের তখনও মুক্তি আসেনি। বরং নতুনভাবে ভিনদেশী আক্রমণের শিকার হয়েছিল বাংলার জনগণ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এ মুক্তিযুদ্ধে আলেমদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ভারত-পাকিস্তানের আলেমরাও সাহায্য করেছিল আমাদের এ মুক্তির সংগ্রামে। বিশেষভাবে ফিদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী (রহ.) এ ক্ষেত্রে বেশ জোরালো ভূমিকা পালন করেছিলেন। বাংলাদেশ থেকে যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ভারতে গিয়েছিল তাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে রিলিফের ব্যবস্থা করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ অভিমুখে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর পাঠানোর প্রতিবাদে তিনি দশ হাজারেরও বেশি মানুষ নিয়ে দিল্লির মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে তার অকৃত্রিম এ ভালোবাসার পরিপ্রেক্ষিতে অতি সম্প্রতি বালাদেশ সরকার তাকে বিদেশী বন্ধুদের স্বাধীনতা সম্মাননা প্রদান করেছে। ২০১৩ সালে জাতীয় স্বাধীনতা পদক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে তার পক্ষে এ পদক গ্রহণ করেন তার সুযোগ্য সন্তান সাইয়্যিদ মওদুদ মাদানী।

তাই একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলন শুধু এ দেশের ভূখণ্ডকেন্দ্রিক কোনো সংগ্রাম নয়। বরং সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বেনিয়াদের কবল থেকে মুক্তির শেষ ধাপও।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যদিও পুরো জাতির অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছিল। তবে এর বিরোধিতাও কম করা হয়নি। বরং ইসলামের নাম ভাঙিয়ে এ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মাওলানা হুসাইনুল বান্না বলেন, নির্দিষ্ট একটি দল ইসলামের লেভেল লাগিয়ে মুক্তিযুদ্বের বিরোধিতা করেছিল। হক্কানি আলেমগণ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে সভা-সমাবেশ বা সক্রিয় কোনো কার্যক্রম করেনি। মাওলানা হুসাইনুল বান্নার কথাটি সঠিক হলেও সমাজে আমরা দেখতে পাই যে, মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে পাকিস্তান ইস্যুতে অনেক আলেমেরই কেমন যেন একটু দুর্বল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে মূল ব্যাপারটি হল ১৯৬৪ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানিদের ভারত যাওয়া-আসা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। যার ফলে তখন এ দেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য দেওবন্দ না গিয়ে ব্যাপকহারে ছাত্ররা পাকিস্তান যাওয়া শুরু করল। এদিকে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হচ্ছিল। তখনকার আলেম সমাজের অনেকেই ছিল পাকিস্তান পড়ুয়া, আবার মুক্তিযুদ্ধে যেহেতু ভারতের সরাসরি সহযোগিতা ছিল। তাই অনেকের আশংকা ছিল এ ভূখণ্ড ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায় কিনা। যেহেতু পাকিস্তান ছিল মুসলিম দেশ, একটি মুসলিম দেশ হিন্দু রাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে যাবে এমন আশংকা থেকেই অনেক আলেম তখন নীরব ছিলেন। তবে সক্রিয়ভাবে দেওবন্দি ধারার কোনো আলেম মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল না।

মাওলানা বান্নার কাছে আরও জানতে চেয়েছি, আলেম সমাজ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী নয়, তবু সমাজের মূল স্রোতধারার সঙ্গে তাদের মিল নেই কেন? প্রত্যয়ী এ আলেম বলেন, আসলে সুশীলসমাজ ও সমাজের মূল ধারার সঙ্গে আলেমদের অদেখা একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কোনো মতপার্থক্য বা বিবেদের কারণে নয়, তবু যোগাযোগ ও আন্তরিকতার অভাবে এমনটি ঘটেছে। তবে এখন আর আগের অবস্থা নেই। ব্যক্তিগত পর্যায় ও বিভিন্নভাবে আলেমদের সঙ্গে সুশীলসমাজ ও সাধারণ শিক্ষিতদের মাঝে সম্পর্ক গড়ে উঠছে। তাই এসব দূরত্বও অনেক কেটে গেছে। তা ছাড়া আমাদের নিজস্ব কিছু দুর্বলতাও রয়েছে। যেমন মাদ্রাসাগুলোতে এখনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ানো হয় না। এসব ব্যাপারে শিক্ষাবোর্ডগুলোর নজর দেয়া উচিত।

বিজয় ও মুক্তির সুন্দর এক স্বপ্ন নিয়ে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতা-সংগ্রামে। হাজারও ত্যাগ ও জীবনের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বপ্নের বিজয়। স্বাধীনতা যেমন আল্লাহর প্রদত্ত সব সৃষ্টির মৌলিক অধিকার তেমনি তা অর্জনও হয়েছে সবার সম্মিলিত প্রচষ্টায়। তাই শিক্ষিত-অশিক্ষিত, কৃষক, শ্রমিক, চাকুরে, বণিক, আলেমসহ সবার দায়িত্ব হল কষ্টে পাওয়া এ বিজয়কে রক্ষা করা। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন তথা সুখী সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলাটাই এখন মুখ্য বিষয়। বিজয়ের আনন্দে হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে বিজয়মাল্য বয়ে বেড়ানো কঠিন।

শীলনবাংলা/shilonbangla.com/এমআর/৩০১

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com