সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৮:০১ অপরাহ্ন

ওয়াজ মাহফিল হোক রাজনীতি মুক্ত

ওয়াজ মাহফিল হোক রাজনীতি মুক্ত

ওয়াজ মাহফিল হোক রাজনীতি মুক্ত

আমিনুল ইসলাম কাসেমী

ওয়াজ মাহফিল আমাদের এই পাক-ভারত উপমহাদেশের মানুষের জন্য বড় এক নিয়ামত। এরকম নির্বিঘ্নে দ্বীন ইসলামের কথা বলার সুযোগ পৃথিবীর সব দেশে নেই। সব জায়গাতে এভাবে দ্বীনি প্রোগ্রাম করা যায় না। কিন্তু মহান আল্লাহর মেহেরবাণীতে এই দেশে অবাধে দ্বীনের কথা বলা যায়। কুরআন-হাদীসের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়।

বাংলাদেশ একটা ছোট দেশ। এদেশে অধিকাংশ মুসলমান বাস করে। আবার এখানে রয়েছে হাজার হাজার দ্বীনি মাদ্রাসা। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী মাদ্রাসাতে লেখাপড়া করে থাকে। এসব ইলম পিপাসু ছাত্রদের তালীম দেওয়ার জন্য রয়েছে লাখো আলেম। এছাড়া পুরো দেশব্যাপি রয়েছে মসজিদ। প্রতিটি মসজিদে রয়েছে একজন ইমাম। এভাবে পুরো দেশটাতে আলেম-উলামাতে ভরপুর। দেশের কোন অঞ্চল আলেম ছাড়া নেই।

আমাদের দেশে শীতের মৌসুমে সাধারণত ওয়াজ মাহফিল বেশী হয়ে থাকে। একদম অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে নিয়ে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত ওয়াজ মাহফিল হয়। দেশের শহর-বন্দর থেকে নিয়ে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন দেখা যায়। বিশেষ করে এদেশের মাদ্রাসাগুলো এবং কোথাও কোথাও মসজিদের পক্ষ থেকে মানুষের জন্য ওয়াজের ইন্তেজাম করা হয়ে থাকে।
ওয়াজ মাহফিলটা মুলত মানুষকে সহিহ রাস্তা দেখানোর জন্য। অন্ধকারাচ্ছান্ন-জাহালাতে ভরপুর সমাজে দ্বীন ইসলামের আলো বিতরণই মুল মাকসাদ। বিশেষ করে বয়স্ক এবং দ্বীনহীন মানুষকে দ্বীনের দিশা দেওয়া। সঠিক রাস্তা বাতলানো, সমাজ থেকে মূর্খতা দুর করা, এমনই এক কর্মসূচি হাতে নিয়েই ওয়াজের ব্যবস্থা করা হয়। মানুষকে আহবান করা হয়।

ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে যেভাবে মানুষ দলবেঁধে হাজির হয়, অন্য কোন প্রোগ্রামে এমন দেখা যায় না। যেখানেই ওয়াজের মাহফিল সেখানেই হাজারো জনতার সমাগম। কোথাও লাখো জনতার উপস্থিতি চোখে পড়ে। সর্বস্তরের মানুষ হাজির হয়। বিশেষ করে যুব সমাজ যেন এখন বেশী ঝুকে পড়েছে ওয়াজ মাহফিলের দিকে। এখন তো প্রচার-মিডিয়ার যুগ। কোথাও ওয়াজ মাহফিলের ইন্তেজাম হলে খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আবার মাহফিলে যিনি ওয়াজ করেন, তার ওয়াজ ধারণ করে ইউটিউব-ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে সেটা তাড়াতাড়ি মানুষের কাছে চলে যাচ্ছে। যে কারণে ওয়াজ মাহফিলগুলো এখন জমজমাট সব জায়গাতে। মানুষের নজরে সব সময়।

ওয়াজ মাহফিলের বক্তা সাধারণত মাদ্রাসার শিক্ষক এবং মসজিদের ইমামগণ। তাঁরা অবসর সময়ে এই মহৎ কাজগুলো করে থাকেন। ছাত্রদের তালীমের ফাঁকে ফাঁকে এবং ইমামতির ফাঁকে দেশের বিভিন্ন জায়গাতে ওয়াজের জন্য বের হন। তারা রীতিমত ওয়াজের প্রোগ্রাম সেরে আবার তাঁদের কর্মস্থলে ফিরে যান। আবার কেউ আছেন পেশাদার ওয়ায়েজ। ওয়াজ করাই তাদের পেশা। অন্য কোন কর্মে তারা নেই। পুরো মৌসুম তারা ওয়াজে কাটিয়ে দেন। এভাবে বিভিন্ন পীরের খানকা কেন্দ্রিক ওয়াজ মাহফিল হয়।পীর সাহেবগণও দেশের বিভিন্ন জায়গাতে সফর করেন। তাঁরাও ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েতের উপরে চালানোর কোশিশ করেন।

মোটকথা ওয়াজ মাহফিলগুলোর মূল হার্ট বা প্রাণ হলো আলেম সমাজ। আলেম- উলামা ছাড়া ওয়াজ মাহফিল চিন্তা করা যায় না। আলেমগণ হলো নৌকার মাঝি বা ট্রেনের ইঞ্জিনের মতো। তাঁরা যেদিকে নিবেন, সাধারণ জনতা সেদিকে ঝুকে যাবে। যদি তাঁরা ভালোর দিকে আহবান করেন, পাবলিকও সেদিকে দৌড়াবে। আর যদি তাঁরা মিসগাইড করেন,পাবলিকও ভুল পথে চলবে।

এজন্য ওলামায়েকেরামের অনেক সতর্ক হওয়া দরকার। বিশেষ করে ওয়াজ মাহফিলের ক্ষেত্রে খুবই সজাগ থাকতে হবে। ওয়াজ মাহফিলের উদ্দেশ্য যেখানে মানুষের ইসলাহ বা সংশোধন, সেখানে এমন ওয়াজ করা উচিত যাতে স্রোতাগণের ফায়দা হয়। তারা যেন আলেমদের ওয়াজ শুনে নিজেকে সংশোধন করতে পারে। স্রোতাদের যেন উপকার হয় এরকম ওয়াজ সকলের কাছে কাম্য।

বড় দুঃখের বিষয়, বর্তমানে কিছু কিছু বক্তা আছেন, যারা ওয়াজ মাহফিলের মূল মাকসাদ বা উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়েছেন। নিজের ইচ্ছেমত ওয়াজ করেন। তাদের ওয়াজে মানুষের সংশোধনের কথা নেই।কোন খোরাক পাওয়া যায় না, বরং কিছু আপত্তিকর কথা উপস্থাপন করেন, যাতে ওয়াজ মাহফিল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ে। দেশের মাঝে ফেৎনা-ফাসাদ তৈরী হয়। যেটে খুবই আপত্তিকর।

নিম্নে তার কিছু বিবারণ তুলে ধরছি-
এক. যেমন কিছু বক্তা ওয়াজ মাহফিলকে রাজনীতির মঞ্চ বানিয়ে ফেলেছেন। সেখানে লাগামহীন-অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তৃতা করেন। যেটা সরকার বা কোন দলের বিরুদ্ধে গিয়ে পড়ে। যেটা দেশ ও জাতির জন্য হুমকি স্বরুপ। কেউ রাষ্ট্র বিরোধী বক্তব্য দেন। যেটা চরম অন্যায়। কেউ দেশের সরকার প্রধান এর বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলেন এবং জনতাকে উস্কে দেন। এটা আসলেই অমার্জনীয় অপরাধ। এসব বিষয় পরিহার করতে হবে।

দুই. কেউ দলিল ছাড়া কথা বলেন। কারো সমালোচনা করতে গিয়ে তথ্য ছাড়া বক্তৃতা করেন। কোন বাতিল ফেরকা সম্পর্কে আলোচনা করে ভিত্তিহীন কথা দিয়ে। এসব বিষয় এড়িয়ে যাওয়াটা ভাল। যাতে কোন ফেৎনা সৃষ্টি না হয়।
তিন. কিছু ওয়ায়েজ আছেন কমেডিয়ান। যারা ওয়াজের ষ্টেজে বসে হাসি-তামাশা করে সময় কাটান। এর দ্বারা ওয়াজ মাহফিলের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। সেই ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ থাকছে না। এসব নিয়ে সাধারণ মানুষ সমালোচনা করছে।
চার. কেউ আছেন গানের শিল্পি। সেখানে বিভিন্ন জনপ্রিয় হিন্দি এবং বাংলা গানের নকল করে গান পরিবেশন করে থাকে। যেটা স্রোতাদের গানের সুড়সুড়ি দিয়ে থাকে।

পাঁচ. কিছু আছে মূর্খ ওয়ায়েজ। ওরা আলেম নয়। মুখস্থ ওয়াজ করে। ভুল ওয়াজ করে তারা। যাতে স্রোতারা গোমরাহির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
এভাবে বিভিন্ন ধরনের বক্তারা ওয়াজের পরিবেশটা বিনষ্ট করে দিচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বক্তৃতা এবং ওয়াজের ময়দানের মূর্খ বক্তার ওয়াজ জাতিকে বেশী সর্বনাশ ডেকে আনছে। এজন্য ওয়াজ মাহফিলে সব বাদ দিয়ে ইসলাহী আলোচনা হওয়া দরকার। ওয়াজ মাহফিল সমালোচনার উর্ধে থাকতে হবে। যাতে সব ধরনের মানুষ নির্বিঘ্নে সেখানে বসতে পারে। দেশের বিরুদ্ধে, দেশের সরকার প্রধানের বিরুদ্ধে ওয়াজ মাহফিলে কথা বলা চরম অন্যায় কাজ। এ জাতীয় কর্মকান্ড পরিহার করতে হবে সকলকে। রাজনৈতিক বক্তৃতা একদম দেওয়া ঠিক হবে না। সহিহ দ্বীনের আলোচনা এবং ইসলাহ বা সংশোধন হওয়ার কথা বেশী হোক। এই কামনা-বাসনা রইল। আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com