বৃহস্পতিবার, ৩০ Jul ২০২০, ০৬:৪৩ অপরাহ্ন

এগিয়ে চল কওমি নাবিক

এগিয়ে চল কওমি নাবিক

আমিনুল ইসলাম কাসেমী :: সমুদ্রের জাহাজ পরিচালনাকারীকে নাবিক বলে। উত্তাল- সমুদ্রে অত্যান্ত সতর্কতার সাথে চলতে হয় নাবিককে। খুব সাবধানে থাকতে হয় সব সময়। কেননা একটু এদিক- সেদিক হলে তো আর গন্তব্যে পৌছানো যাবেনা। ভুলের কারণে বড় বিপদের সম্মুখিন হতে হবে।

এক সময় নাবিকগণ আকাশের তারকা দেখে জাহাজ চালাতেন।দিক নির্ধারন করতেন। কোনদিকে যেতে হবে,সেটা আকাশের তারকার সাহায্য নিতেন।
এরপর এসে গেল কম্পাস। কম্পাসের সাহায্যে সহজেই দিক নির্ণয় করা যায়। সেটা দিয়ে নাবিকেরা চালান সমুদ্রের জাহাজ।

আগে তো এত অত্যাধুনিক জাহাজ ছিলনা। এখন তো পাঁচতারা জাহাজ।দুনিয়ার সব আরাম – আয়েশ ভরে দেওয়া হয়েছে। কি নেই তাতে? সবই আছে। আগেকার দিনের জাহাজ ছিল তো কাঠের তৈরী বড় নৌকার মত। পাল তোলা জাহাজ। কোন ইন্জিন আবিস্কার হয়নি তখনো।

এখন দুনিয়ার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি কাজ করছে জাহাজে। হাজার হাজার মানুষের আমোদ- প্রমোদের জায়গা এখন জাহাজের মধ্যে। অনেক দেশে তো প্রমোদ তরী হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে বহু জাহাজের।

জাহাজের নাবিকদের এখন আধুনিক যন্ত্রপাতি। এখন আর আকাশের তারকারাজি দেখে চলতে হয় না। জোয়ার – ভাটার অপেক্ষা করতে হয় না। সকল ফ্যাসিলিটি জাহাজে রয়েছে। জাহাজে বসেই এখন নাবিকেরা হাজার হাজার কিলোমিটারের সংবাদ আদান- প্রদান করছেন।

জাহাজের গতি সেই আগের মত নেই। আগে যে রাস্তা দুই তিনমাস লাগত, এখন লাগে দশ দিন। দশ দিনের রাস্তা লাগে এখন দুই দিন।

কওমী মাদ্রাসার পরিচালকগণ ঠিক সমুদ্রের নাবিকের মত। সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয় সব সময়। অথৈ সমুদ্রের জলরাশির সাথে মোকাবেলা করে চলতে হয়। বছরের পর বছর একটানা বিরামহীন ভাবে পথ চলা তাদের। কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। কোন সাহায্য- সহযোগিতা করার নির্দিষ্ট লোক নেই। সম্পুর্ণ ভরসা আল্লাহর উপরে।

একটা প্রতিষ্ঠান যখন হাবুডুবু খায় সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে। সেই অবস্হায় হাল ধরে তীরে ভেড়াতে হয়। অনেক সতর্কতার সাথে চলেন কওমীর নাবিকেরা। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কত ঝড়- তুফান, তবুও নাবিক ইস্পাতের ন্যায় মজবুত।ঘুম হারাম থাকে। কেননা, নাবিক যদি ঘুমিয়ে যায়, তাহলে জাহাজ গন্তব্যে পৌছাবে না কোনদিন। নাবিক ভুল করলে জাহাজের যাত্রীদের ভোগান্তির শেষ হয় না।

বর্তমানে কওমীর নাবিকেরা সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় নিমজ্জিত। যে ঝড় উঠছে এখন কওমীর সমুদ্রে, হাল ধরে রাখা বড় কঠিন। কেননা, এমন ঝড় বোধ হয় ওঠেনি কোনদিন। বাতাসের গতিবেগ পুর্বের তুলনায় শত- সহস্র গুণ বেশী। তরী যায় যায় অবস্হা। একবার ঢেউয়ের আঘাতে জলের নিচে চলে যাচ্ছে জাহাজ, আরেকবার আবার উপরে ভেসে উঠছে। তবুও নাবিক হাল ধরে আছেন শক্ত ভাবে।

আমাদের আধুনিক কোন যন্ত্র পাতি নেই। উন্নত প্রযুক্তি এখনো আমরা ধারণ করতে পারিনি।। শত ঝড়- ঝন্জা আসলেও সেই পুরোনো সব কিছু। কাবু করে দিচ্ছে আমাদের। তারপরেও আমরা জাহাজ পরিচালনা করে যাচ্ছি কওমীর নাবিকগণ।

তবে এখানে একটা কথা, বর্তমানের এই আধুনিক যুগে উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্বেও আমরা সেই পুরোনা ষ্টাইলে আর কত দিন জাহাজ চালাব? আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করছিনা এমন নয়। সর্ব ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ছোঁয়া। হাতে মোবাইল , পকেটে মোবাইল, ইন্টারনেট চালাচ্ছি এখন কওমীর নব্বই ভাগ মানুষ। ফেসবুক,ইমু,ওয়াটসআপ, ইউটিউব, মেইল ব্যবহার করি দেদারসে। অনেক বড় বড় বুজুর্গের ওয়াজ এখন ইউটিউবে। নামকরা শায়েখগণ ইমু -ওয়াটসআপ ব্যবহার করেন।

প্রয়োজনের তাগিদে, যুগের চাহিদানুসারে সকল প্রযুক্তির সেবা আমরা নিচ্ছি। অথচ এক সময় এগুলোর ঘোর বিরোধী আমরা ছিলাম। ইন্টারনেট,ডিস লাইনের বিরুদ্ধে মিছিল- মিটিংও আমরা করেছি অনেক। কিন্তু যুগের তালে পড়ে আমরা নিরুপায়। এখন সব কানেকশন নিয়েছি আমরা।

ঠিক কওমী মাদ্রাসা গুলো কি বর্তমান প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে কিছু করা যায় না? আধুনিক প্রযুক্তির সাথে অনলাইনে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ঢেলে সাজানো গেলে মনে হয় আরো এগিয়ে যেতাম আমরা।

এই যে ভর্তির সময় চলছে এখন। প্রত্যেক কওমী মাদ্রাসা গুলো অনলাইনে ভর্তির কার্যক্রম করলে অনেক সুবিধা হত। ছাত্রদের এই লক ডাউনে আর বাড়ি থেকে বের হয়ে শত শত কিলোমিটারের রাস্তা সফর করতে হত না। শিক্ষার্থীদের টাকা বেঁচে যেত।

অনলাইনে ছাত্রদের তো তালিম দেওয়া যায়। এখন কারো বাড়িতে এন্ড্রয়েড সেট বা কম্পিউটর নেই এরকম খুব কম। আমাদের বাৎসরিক পরীক্ষা হলনা। বোর্ড বলেন আর মাদ্রাসা বলেন, কোনটাই তো হয়নি। অনলাইনে সিষ্টেম চালু থাকলে হয়ত সে গুলো করা সম্ভব ছিল।

আমার একজন বন্ধু জেদ্দাতে স্বপরিবার থাকেন।সে আমাকে ফোনে বলল, তার ছেলে বাসায় বসে বসে অনলাইনে পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার রেজাল্ট ও পেয়েছে।

এগুলো আমাদের কওমী মাদ্রাসাতে চালু করা যাবেনা এমন নয়। সেরকম ছাত্র যে আমাদের নেই, তাও নয়। সবই আছে। এখন প্রয়োজন কওমীর নাবিকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

কওমীর নাবিকদের তাই প্রয়োজন মাফিক জামানার চাহিদা অনুসারে পক্ষেপ নিতে হবে। আমি কোন প্রমোদ তৈরী বানাতে বলছিনা। হ্যাঁ, সমুদ্রে চলতে যতটুকু আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করা দরকার,ততটুকু করতে হবে। নচেৎ ঢেউয়ের তালে আমরা হারিয়ে যেতে পারি। সেই সাথে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা আমাদের সন্তানদের।

এজন্য বলছি, এগিয়ে চল কওমীর নাবিক। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com