শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৩ অপরাহ্ন

একাত্তরে পরাজয়ের আগের দিনগুলোতে ইয়াহিয়া খান

একাত্তরে পরাজয়ের আগের দিনগুলোতে ইয়াহিয়া খান

তেসরা ডিসেম্বর, ১৯৭১। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান তার এডিসি, স্কোয়াড্রন লিডার আর্শাদ সামি খাঁকে ডেকে বলেছিলেন যে বিকেল ঠিক চারটের সময় জেনারেল হামিদ ইসলামাবাদে রাষ্ট্রপতি ভবনে আসবেন। তারা এমন একটা জায়গায় যাবেন, যেটার কথা নিজের এডিসি-কে বলতে পারবেন না আগে থেকে।

চারটের সময়ে  জেনারেল হামিদ তার নিজের মিলিটারি জিপ চালিয়ে এসেছিলেন। জিপে তার পাশেই চড়ে বসেছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া। আর দুজন এডিসি পিছনের আসনে। বিপত্তি বাধল শুরুতেই। কোথা থেকে একটা বড় শকুন এসে জিপের সামনে বসে পড়ল।

হর্ন দেওয়া হলো, কিন্তু তাতেও শকুনটার নড়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। ইয়হিয়া খান জিপ থেকে নেমে গিয়ে হাতের ব্যাটনটা দিয়ে শকুনটাকে সরানোর চেষ্টা করলেন। তা-ও সে নড়ে না! শেষমেষ বাগানে কাজ করা এক মালী দৌড়ে এসে হাতের কোদালটা দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে খোঁচা দিয়ে শকুনটাকে সরালো ওখান থেকে।

দুই জেনারেলকে নিয়ে জিপ এগুলো। তারা চারজন একটা ভবনের সামনে পৌঁছিয়েছিলেন কিছুক্ষণ পরে, যেটাকে বাইরে থেকে দেখলে গুদাম মনে হবে। হর্ন বাজাতেই এক রক্ষী বাইরে এসে যখনই জেনারেল ইয়াহিয়াকে দেখল, সঙ্গে সঙ্গে স্যালুট করে দরজা খুলে দিল। ভবনের সামনেই অপেক্ষা করছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল রহিম খাঁ। ওই ভবনটি আসলে ছিল পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর সদর দপ্তর – সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে রাখা হয়েছিল সেটিকে।

ভেতরে যখন বৈঠকে বসছেন সবাই, ততক্ষণে পাকিস্তানের এফ-৮৬ বোমারু বিমানগুলো ভারতের ওপরে হামলা করার জন্য উড়ে গেছে। আধঘন্টার বৈঠকের পরে যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ফিরে যাওয়ার সময় হলো, তখনই বিমান হামলার সাইরেন বাজতে শুরু করল।

জেনারেল খানের এডিসি আর্শাদ সামি বলেছেন, “দেখলাম খুব নিচু দিয়ে বেশ কয়েকটা যুদ্ধ বিমান উড়ে গেল। ইয়াহিয়া খান ড্রাইভারকে ইঞ্জিন বন্ধ করে, আলো নিভিয়ে দিতে বলেছিলেন। তখন উল্টোদিক থেকে আরো কযয়েকটা বিমান উড়ে আসতে দেখলাম। ইয়াহিয়া খান বেশ গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন এগুলো আমাদের ইন্টারসেপ্টার বিমান।”

আসলে ৭১-এর যুদ্ধটা তখন ইয়াহিয়া খানের প্রত্যাশার ঠিক উল্টো দিকে গড়াচ্ছিল। চারদিক থেকেই ব্যর্থতার খবর আসছে। চীন থেকে কোনো সাহায্য পাওয়ার আশা ত্যাগ করেছেন তিনি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে ফোন করেছিলেন জেনারেল ইয়াহিয়া, কিন্তু নিক্সন তখন একটা বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন।

আর্শাদ সামি খাঁ বলছিলেন, “১৩ ডিসেম্বর রাত প্রায় দুটোর সময়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের টেলিফোন অপারেটর আমাকে জানিয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ফোন করেছেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ঘুম থেকে ডেকে তুলি। টেলিফোন লাইনটা খুব খারাপ ছিল। জেনারেল আমাকে ঘুম জড়ানো গলায় বলেছিলেন আমি যেন অন্য টেলিফোনে সব কথা শুনি আর লাইন যদি কেটে যায় তাহলে আমি-ই যেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাই।”

প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কথার মূল বিষয়টা ছিল যে তিনি পাকিস্তানের সুরক্ষার জন্য খুবই চিন্তিত আর তাই সাহায্যের জন্য সেভেন্থ ফ্লিট বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা করিয়ে দিয়েছেন।

‘নিক্সনের ফোন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেনারেল ইয়াহিয়া আমাকে বললেন জেনারেল হামিদকে ফোন কর। হামিদ ফোনটা ধরতেই ইয়াহিয়া প্রায় চিত্কার করে বলেছিলেন, উই হ্যাভ ডান ইট। আমেরিকান্স আর অন দেয়ার ওয়ে,’ বলছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার আর্শাদ সামি খাঁ। সেভেন্থ ফ্লিট পরের দিন তো দূরের কথা, ঢাকার পতনের দিন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়নি। শেষমেশ দেশকে দুটুকরো করে ‘নিজের ধার পরিশোধ’ করতে হয়েছিল জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে!

কোন ঋণ পরিশোধ করেছিলেন তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে দিয়ে? জেনারেল এস কে সিনহা তার আত্মজীবনী ‘আ সোলজার রিমেমবার্স’-এ লিখেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশয়ের কাছে ইয়াহিয়া খানের সেই ধার নেওয়ার কাহিনি।

১৯৪৭-এ স্বাধীনতার সময়ে মানেকশ আর ইয়াহিয়া— দুজনই দিল্লিতে সেনা সদর দফতরে কর্মরত ছিলেন।

ইয়াহিয়ার অনেক দিনের পছন্দ ছিল মানেকশয়ের লাল রঙের মোটরসাইকেলটা। ১৯৪৭-এ যখন ইয়াহিয়া পাকিস্তানে চলে যাচ্ছেন, তখন মানেকশ নিজের লাল মোটরসাইকেলটা ইয়াহিয়াকে এক হাজার টাকায় বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

ইয়াহিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে পাকিস্তানে পৌঁছিয়েই টাকাটা তিনি মানেকশকে পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু সেটা তিনি ভুলে যান। ৭১-এর যুদ্ধের পর মানেকশ মজা করে বলেছিলেন ‘ইয়াহিয়া খানের চেক আসবে বলে ২৪ বছর অপেক্ষা করেছি, কিন্তু চেক আর আসেনি। সেই ৪৭-এ যে ধার করেছিলেন, নিজের দেশের অর্ধেকটা দিয়ে সেই ধার শোধ করলেন ইয়াহিয়া।’

ইয়াহিয়া খানের যে শুধু মানেকশয়ের লাল মোটরসাইকেলের প্রতি নজর ছিল, তা না। তার নারী প্রীতিও সবাই জানে। তাকে ‘লেডিজ ম্যান’ বলা হতো। অনেক নারীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল— যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন সঙ্গীত শিল্পী ‘মালিকা-এ-তরন্নুম’— নূরজাহান। জেনারেল ইয়াহিয়া নূরজাহানকে নূরি বলে ডাকতেন, আর তিনি ইয়হিয়াকে ‘সরকার’ বলে সম্বোধন করতেন। নূরজাহান আর ইয়াহিয়ার সম্পর্ক নিয়ে একটা গল্প শোনাচ্ছিলেন আর্শাদ সামি।

আর্শাদ সামি খাঁর সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন বিবিসি হিন্দির রেহান ফজল।

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com