বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০, ১২:১৫ পূর্বাহ্ন

একজন বাড়িঅলার ইন্তেকালে ভেঙেছে হৃদয়

একজন বাড়িঅলার ইন্তেকালে ভেঙেছে হৃদয়

একজন বাড়িঅলার ইন্তেকালে ভেঙেছে হৃদয়

।। মাসউদুল কাদির।।

আবুল খায়ের পাটোয়ারী চলে গেছেন পৃথিবীর আলো বাতাস ছেড়ে। তার হাতে গড়া ভবনেই আমার ওঠার কথা। জুলাইয়ের এক তারিখ থেকেই তাঁর ওখানে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে উঠবার কথা ছিলো। যেহেতুু আগের বাসায় চলতি মাসে থাকবার সুযোগ আছে তাই তাড়াহুড়ো করিনি। আবুল খায়ের পাটোয়ারী বিমানে চাকুরি করতেন। এত দারুণ একজন বন্ধুবৎসল মানুষ আমি এর আগে এমন মানুৃষ দেখিনি বললেই চলে। আলেমদের ভালোবাসেন। তাবলিগ পছন্দ করেন। নিজের ভবনে আলেম ও তবলীগীদেরও থাকবার সুযোগ দিয়েছেন। এক সকালে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতে গিয়ে আমি ছাড়া পেয়েছি দুপুরে। তিনি এত মধুময় কথা দিয়ে আমাকে ধরে রাখছিলেন আমি বুঝতেই পারিনি। পরে বাসায় গিয়ে বল্লাম, মানুষটার চোখেমুখে জাদু আছে। একরাশ এমন ভালোবাসা হৃদয় ছাড়া কাউকে এভাবে আটকে রাখা যায় না। ওই ভবনের নিচে থাকেন আতিক মাস্টার। তিনি এখান থেকে চলে যাবেন। কথায় কথায় পাটোয়ারী সাহেব বলছিলেন, আতিক তো আমার ছেলের মতো। আমি তাকে অনেক ভালোবাসি। এখন লকডাউনের সময়। সবারই কষ্ট হচ্ছে। আমি কাউকে কোনো চাপাচাপি করছি না।

আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম তার কথা। তিনি করোনা ভাইরাসকে আমলে নিতে চাইলেন না। যদিও এই করোনাকালেই তিনি চলে গেলেন পরপারে। আল্লাহ তাঁর কবরকে নূর দিয়ে ভরপুর করে দিন। তিনি পুরোনো ঢাকার অনেক চিত্রের কথা বললেন। একবার বিমানের বেশ কয়েকজন মিলে ফ্রান্সে গিয়েছিলেন একটা প্রশিক্ষণে। পাটোয়ারী সাহেবরা তখন একটা ঈদও সেখানে কাটিয়েছিলেন। ঈদের দিন একজন নৌ-মুসলিম তাদের জন্য নানা ধরনের চকোলেট নিয়ে এসেছিলেন। পরদেশে এসব চকোলেট পেয়ে তারাতো যারপরনাই খুশি। ওই নৌ মুসলিম বন্ধুকে সবাই বাংলাদেশে দাওয়াত করেছিলো। অনেকেই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন ওই ভদ্রলোককে। বাংলাদেশকে আপনি কীভাবে জানেন। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমা হয়। টঙ্গী ইজতেমায় বেঁচে থাকলে তিনি যেতে চান। তাবলীগ জামাতের ইজতেমার কারণেই বাঙালি বা বাংলাদেশী মানুষকে তিনি ভালোবাসেন। একজনের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, এই হোটেলে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী আছেন। এ কারণেই ঈদের দিনে তাঁর ছুটে আসা।

তাবলীগের কারণেই ইসলামের খোঁজ পেয়েছেন এই ফ্রান্সের নাগরিক। তার বাবা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য সবধরনের ব্যবস্থা করে ফেলে। পরে একদিন বাবার সঙ্গে বৈঠকে বসেন এই নৌমুসলিম। বুঝাতে থাকেন, তিনি কত ভালো কাজ করছেন। প্রত্যেক দিন সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠেন, কোনো ধরনের মাদক গ্রহণ করেন না। মেয়েছেলেদের নিয়ে আড্ডা দেন না। সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ এমন কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন না। অথচ তার অন্যান্য সব ভাই-বোন সবধরনের অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত। কাউকেই আপনি সৎপথে আনতে পারছেন না। তাহলে আমাকে কেন সুন্দরপথে চলতে বাধা দিচ্ছেন? পরে অবশ্য তার বাবা তাকে তাড়িয়ে দেননি।

এমন অনেক গল্প শোনালেন পাটোয়ারী সাহেব। ৩ জুলাই ২০২০ অফিস থেকে ফিরেই হাজিপাড়া নেমে তালের শাস কিনছিলাম। বাসার দিকে পা বাড়াতেই আবুল খায়ের পাটোয়ারী সাহেব আর নেই-এমন একটা ঘোষণা শুনলাম। আমার সারা শরীর হিম হয়ে এলো। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। জুলাইয়ের এক তারিখ পর্যন্ত আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি সব অনুরোধও রেখেছেন। অথচ আজ তিনি নেই। বাসায় গেলাম। আমার বাচ্চা ও তাঁর মা-ও খুব বেদনাহত হলো। কষ্ট পেল। এরপর দেখতে গেলাম পাটোয়ারী সাহেবের বাসায়। তাঁর ছেলে রাজন ভাই সুন্দর অবয়বের মানুষটিকে দেখালেন, নিথর দেহ নিয়ে পড়ে আছে। আর কোনো দিন তিনি উঠবেন না। আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন।

বাসা বদলের কথা বলছিলাম সবাইকে। আমরা যারা পত্রিকায় কাজ করি, রাজধানী ছাড়ছে মানুষ, ভাড়া কমিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না ভাড়াটে এমন সংবাদ এখন প্রতিদিনের। একটা নিউজ দেখলাম, রাজধানীর আশাপাশ থেকেও অনেকে চলে যাচ্ছে নাড়ীর টানে। এবারের নাড়ীর টান সত্যিকার অর্থেই কী জিনিস তা খুব হারে হারে টের পাচ্ছে ভুক্তভোগী মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে বলছেন, বাড়িঅলাদের কথা কেউ বলছেন না। তারাও বিপদে আছেন। তা অবশ্যই সত্যি। সমস্যাটা যারই হোক, তারই কষ্ট। তা অন্যের বোঝাটা কঠিন। এ রাজধানীতে ভাড়াটে আর বাড়িঅলার মধ্যে অলিখিত একটা সুসম্পর্ক সবসময় বিরাজমান। না হলে অনেক বেশি খারাপ সংবাদ পাওয়া যেতো। দেশের অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় ভাড়াটে আর বাড়িঅলার মধ্যে তেমন কোনো কিছুর সংবাদ পাওয়া যায় না। অনেকে বলে থাকেন, ভাড়াটেরা সবসময় বাড়িঅলার হুকুম তামিল করেন। কোনো ক্ষেত্রেই তারা কোনো অধিকারের কথা বলতে পারেন না। সবসময় মুখ কস্টেপে বন্ধই রাখতে হয়। ভাড়াটে মুখ বন্ধ রাখেন বলেই কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে না। আবার কোনো ভাড়াটে নিয়ম ভঙ্গ করলে বাড়ি ভাড়ার আইনে শিকার হন। তিনি নোটিশ পেয়ে যান। সহজেই ছাড়তে হয় বাসা। সাধারণত ভাড়াটেরা নিয়ম মেনে চলবার চেষ্টা করে থাকেন। এর উল্টো যে নয় তা কিন্তু ঠিক নয়। যেমন ছাদ ব্যবহারের সুযোগ কেউ পেলে শেষ তক অপব্যবহারও করেন। ফলে পথবন্ধ হয়ে যায় অন্য সবার জন্যও।

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com