শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ১২:৪৭ পূর্বাহ্ন

ইসলামি হুকুমতের খণ্ডিত ধারণার একাল সেকাল

ইসলামি হুকুমতের খণ্ডিত ধারণার একাল সেকাল

রাজকাহন । সগীর আহমদ চৌধুরী

ইসলামি হুকুমতের খণ্ডিত ধারণার একাল সেকাল

এক. ইসলামি হুকুমতের খণ্ডিত ধারণা নিয়ে আমাদের বেড়ে ওঠা

জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘ইসলামি রাজনীতি সঠিক পথে এগুচ্ছে কি’? সচেতন অনেকে এক বাক্যে বলেছেন, ‘না।’ কেন? এগুচ্ছে না কেন? প্রশ্নের জবাব যদি ‘না’-ই হয়ে থাকে তবে সঠিক পথ কী?

ইসলামি রাষ্ট্র বা হুকুমতের ধারণাটি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত শব্দোৎস ‘হুকম’ ও ‘আমর’ থেকে অর্জিত হয়েছে। আর পবিত্র কুরআনে এ শব্দদুটোর সংশ্লিষ্ট অন্তত চারটি কাজ বা করণীয় কর্তব্য পাওয়া যায়। যথা-

১. আইন জারি, আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন বা নিফাযে শরীয়ত

২. পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থা

৩. আদল, ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতা

৪. ইহসান, সেবা বা মানকল্যাণ।

ইসলামি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতে এ চারটি হচ্ছে ইসলামি রাষ্ট্র, ইসলামি হুকুমত বা ইমারতে ইসলামির রোকন, প্রধান স্তম্ভ বা বুনিয়াদি উসুল। এসব উসুলের মধ্যে নিম্নক্রমে একটি অন্যটির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ইহসানের, ইসলামি রাষ্ট্রকে এজন্যই কল্যাণ রাষ্ট্র বলা হয়। এরপর আদল-ইনসাফের। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মতে, আল্লাহ তাআলা একটা কুফরি রাষ্ট্রকে স্থায়িত্ব দেন যদি সেখানে ইনসাফ বজায় থাকে, আর একটি ইসলামি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দেন যদি সেখানে ইনসাফ না থাকে। খাজা নিযামুল মুলক তুসী (রহ.)-এর সিয়াসতনামায় কথাটিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস হিসেবে দাবি করা হয়েছে। তারপর গুরুত্ব পূর্ণ হচ্ছে, সরকার ব্যবস্থা হবে জনবান্ধব, গণসম্মত ও পরামর্শভিত্তিক। এই তিনটি উসুলের পরই সেখানে শরীয়ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, ইসলামি হুকুমতের সর্বশেষ উসুল।

এমন নয় যে, আল্লাহর আইন বা শরীয়ত জারি নেই কিন্তু অন্যান্য প্রিন্সিপ্যালগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত আছে তাহলে সেটিকে ইসলামি হুকুমত বলা হবে না। হবে, অবশ্যই হবে। বরং এ চার উসুলের যেখানে যেটুকু বাস্তবায়িত আছে সেটি ততোটুকু ইসলামি। কিন্তু যেখানে শুধু শরীয়ত বাস্তবায়িত আছে, কিন্তু সরকার ব্যবস্থা একনায়ক-স্বৈরতান্ত্রিক, জনগণের ওপর জুলম-নিপীড়ন চলে, ইহসানের বালাই নেই তাহলে সেটা অবশ্যই ইসলামি হুকুমত নয়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ হিসেবে বর্তমান যেকোনো মুসলিম রাষ্ট্রের চেয়ে ইসলামি হুকুমতের প্রিন্সপ্যালগুলো পশ্চিমা বা অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোতেই বেশি অনুসরণীয় হচ্ছে। আর এ কারণে অর্থাৎ কল্যাণ, ন্যায় বিচার ও গণসম্মত সরকার ব্যবস্থার কারণেই অমুসলিমরা এতো শক্তিশালী, তাদের রাষ্ট্রগুলোর এই স্থায়িত্ব।

ঘটনা হচ্ছে, ইসলামি রাজনীতিক, ইসলামি দলের কর্মি বা ইসলামপন্থি বলতে যাদের বোঝায় তাঁরা ইসলামি হুকুমতের একটা খণ্ডিত ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠেছে। আর তা হচ্ছে, ইসলামি রাষ্ট্র মানে শরীয়ত, আল্লাহর আইন জারি অর্থাৎ হত্যার বদলে হত্যা, চোরের হাত কাটা ও ভ্যাবিচারীদের পাথর ছুড়ে মেরে হত্যা তথা কিসাস-হুদুদ-রজম ইত্যাদি। মোটামুটিভাবে তাঁদের কাছে ইসলামি হুকুমত হচ্ছে, আইনতাত্ত্বিক বিষয়। তাঁদের ধারণায় এর বাইরে আর কোনো তত্ব নেই, জনআকাঙ্ক্ষা, মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে কোনো চিন্তা নেই, কোনো কর্মসূচি নেই, কোনো লক্ষ্য নির্ধারিত নেই। ইসলামি রাজনীতি যে সঠিক পথে এগুচ্ছে না এটা তার প্রথম ও প্রধান কারণ।

লেখক : রাজনীতিক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com