বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ০৮:৩৬ অপরাহ্ন

আড়মোড়া ভাঙছে না আলেমদের

আড়মোড়া ভাঙছে না আলেমদের

রাজনীতিসাফল্য : আড়মোড়া ভাঙছে না আলেমদের 

সগীর আহমদ চৌধুরী : বিভিন্নভাবে সবাই দীনের খেদমত করছেন। তাবলীগ, জামায়াত ও ইসলামি দলসমূহও করছে। কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে তাঁরা ওলামায়ে কেরাম হযরাতকে অভিযুক্ত করা শুরু করে, তীব্র সমালোচনা করে, গালমন্দ করে। ওলামায়ে কেরাম সবকিছু ছেড়ে ব্যাপকভাবে কেন এসব দলের হয়ে কাজ করে না এটা নিয়েই তাদের যত দুঃখ। তারা মনে করে, যেসব ইলম ও তত্ত্বজ্ঞান সমাজে বাস্তবায়িত হয় না সেসব চর্চার কোনো মানে নেই, এসবের জন্য দীনী মাদারেস, হাজার হাজার ওলামা, মুফতি-মুহাদ্দিস, ইমাম-খতিব, দারসে-তাদরীস এবং কিতাবাদির কোনো প্রয়োজন নেই। এমনকি ইসলামের সাফল্য লাভে ব্যর্থতার সব দায়ও তারা হযরাত ওলামায়ে কেরামের কাঁধে চাপিয়ে দেয়।

ইসলামি দলসমূহ যদি সাফল্য লাভে ব্যর্থ হয় সেই ব্যর্থতা তো তাদের নিজেদের। তাদের দলীয় পলিসি, কর্মপন্থা, কর্মকৌশল এবং কর্মসূচির মন্দতাই এর জন্য দায়ী। কিছু আওয়ামুন্নাস আজ ইসলামি দল বা কোনো দীনী কাজে শরীক হয়ে (যে যে কাজে শরীক হয়) সেটাকেই একমাত্র সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে এবং অন্যান্য সবকিছুকে অপ্রয়োজনীয় ও তুচ্ছবোধ করে। তারা নিজেদের কর্মপন্থার যথার্থতা নিরীক্ষা করার পরিবর্তে ওলামায়ে কেরামের ওপর অনর্থক দায় চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতা বেমালুম ভুলে যায় এবং এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের আত্মশ্রেষ্ঠত্বের আহমকিপূর্ণ তৃপ্তিতে ডুবে থাকে তারা।

আমি মনে করি, ইসলাম প্রতিষ্ঠা এটি যদি ফরয হয় তবে তা ওলামা-আওয়াম নির্বিশেষে সবারই জন্য ফরয। ওলামায়ে হযরাতের ওপর এটির ফরযিয়ত আলাদা করে বর্তায় না। ইলমচর্চা ও ইলমের বাস্তবায়ন এদুটোও কিন্তু আলাদা বিষয়। ইলমচর্চা করবেন ওলামায়ে কেরাম, মানুষের ব্যক্তিজীবনে সেটি প্রতিফলিত করবেন পীর-মাশায়েখ এবং সমাজ জীবনে বাস্তবায়ন করবেন মুসলিম শাসক-সুলতানরা। এখানে মোটামোটি দুইটি খেদমত, ১. ইলমচর্চা ও ২. ইলমের বাস্তবায়ন। যদি ইলমের চর্চাই না হয় তবে বাস্তবায়ন হবে কিভাবে? বাস্তায়িত হচ্ছে না বলে চর্চা বন্ধ করতে হবে কিংবা চর্চার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা হবে কেন? কেউ চর্চা করবেন কেউ বাস্তবায়ন করবেন; আর বাস্তবায়নের জন্যেই চর্চার প্রয়োজন, এটি প্রকারান্তরে বাস্তবায়নেরই অন্তর্ভুক্ত।

সুরা আত-তাওবার ২২ আয়াতে ইলমচর্চার জন্য বিশেষায়িত একটি শ্রেণিকে স্বতন্ত্রভাবে সাধনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাদীস শরীফে ওলামা হযরাতকে আম্বিয়ায়ে কেরামের ওয়ারিস বলা হয়েছে, এটি দুনিয়া বা রাজনীতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নয়, বরং সেটি হচ্ছে ইলমের উত্তরাধিকার। বস্তুত মুসলমানদের চৌদ্দশত বছরের রাজনীতিক ইতিহাসে যারা অর্ধজাহানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের কেউ আলেম বলতে যা বোঝায় তা ছিলেন না। আমি এখানে আলেম বলতে বোঝাতে চাচ্ছি যে, যারা মুহাদ্দিস ছিলেন, কুরআনের ব্যাখ্যাতা ছিলেন, যাদের ইলমি শাগরিদ রয়েছে, যাদের লিখিত ইলমি জ্ঞান-সম্পদ রয়েছে। সেই অর্থে একজন শাসকও কি এমন আছে যে, যিনি কুরআনে তাফসীর লিখেছেন, বুখারী-মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন কিংবা ফিকহের ওপর তাঁদের কোনো কিতাব রয়েছে?

ওলামায়ে কেরাম রাজনীতিতে অবশ্যই শরীক হবেন। তবে তখন তাঁর পরিচয়টি হবে একজন রাজনীতিক হিসেবে, যেমন সুলতান মাহমুদ গজনবী ও বাদশা আলমগীর (রহ.)। তাঁদের আলেম-পরিচিতির চেয়ে রাজনীতিক বা শাসক হিসেবে পরিচিতটা বেশি। আলেমরা রাজনীতিতে শরীক হবেন অর্থ এই নয় যে, যারা বড় ইলমি খেদমতে নিয়োজিত তাঁদেরও সেসব ছেড়ে একমাত্র রাজনীতিতে চলে আসতে হবে। আমি মনে করি যারা বড় ইলমি খেদমেত নিয়োজিত আছেন তাঁদের জন্য একই সঙ্গে প্রচলিত দলীয় রাজনীতি সম্ভব নয়। এটা তাঁদের ইলমি খেদমতকে ব্যহত করবে। এজন্যেই ইসলামি ইতিহাসে এ ধরনের ইলমি খেদমতে নিয়োজিত কাউকে শাসকরূপে আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এধরনের ইলমি খেদমতে নিয়োজিত ওলামায়ে কেরামকেই সবচেয়ে বিদ্ধ করা হচ্ছে তীব্র সমালোচনার তীরে। একটা সময় জামায়াতের লোকজন ওলামায়ে কেরামকে নিয়ে সমালোচনামুখর থাকতো, এখন দেখছি তাবলীগ জামায়াতকে এবং কিছু ইসলামি দলের নেতা-কর্মিদেরকে; এটা খুবই পীড়াদায়ক।

অতীতে ওলামায়ে কেরামের কাজ ছিল জনগণের হৃদয় জয় করা আর শাসকদের কাজ ছিল ভূমি বিজয় করা। শাসকরা আসতেন বীরের বেশে আর ওলামায়ে কেরাম আসতেন দরবেশের বেশে। সুলতানরা শাসন করতেন, আর ওলামায়ে কেরাম জনগণের মাঝে মিশনারি কাজ করতেন। শাসকরা জিহাদ করতেন, ওলামায়ে কেরাম দীনের দাওয়াত মানুষের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতেন। ওলামায়ে কেরাম কখনো শাসকদের বিরোধিতা করতেন না, হ্যাঁ, তারা শাসকদেরকে সমর্থন যোগাতেন, পৃষ্ঠপোষকতা দান করতেন, অভিভাবকত্ব দিতেন, দোয়া করতেন। অন্যদিকে শাসকরা ওলামায়ে কেরামের দরবারের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক রাখতেন, ওলামায়ে কেরামের পরামর্শ নিতেন, তাঁদের নসীহত ও মশওয়ারা নিয়ে রাজ্য পরিচালনা করতেন। পারস্পরিক অঘোষিত সমন্বয় ছিল যেন। কিন্তু এখন যারা কথিত ইসলামি রাজনীতির সাথে জড়িত ওলামায়ে কেরাম যেন তাদের চক্ষুশূল; ওলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধে বিশোদ্গার, বিদ্বেষপোষণ ও তীব্র সমালোচনা তাদের জন্য ডাল-ভাতের ব্যাপার যেন। বুঝি না, ইসলামি রাজনীতর নামে কি এরা ওলামায়ে কেরামের সমালোচনার লাইসেন্স পেয়েছে?

হ্যাঁ, তবে ওলামায়ে কেরামের অনেকে প্রচলিত দলীয় রাজনীতিকে সমর্থন করেন না। তার জন্য ওলামায়ে কেরাম যতোটা না দায়ী, তার চেয়ে কথিত ইসলামি রাজনীতিকদের দায় আরও বেশি। এরা ওলামায়ে কেরামের পৃষ্ঠপোষকতা, অভিভাবকত্ব ও সমর্থন লাভের চেয়ে বরং তাঁদেরকে দলীয় কর্মি হিসেবে পেতেই আগ্রহী বেশি। তা না হওয়াতেই ওলামায়ে কেরামের সমালোচনা হয় তীব্রভাবে। ফলে ওলামায়ে কেরাম প্রচলিত দলীয় রাজনীতিকে তেমন একটা সমর্থন যোগাতে পারেননি।

অন্যদিকে রাজনীতি হিসেবে ইসলামি রাজনীতির সাফল্য বলতে তেমন কিছু নেইও; বরং ইসলামি রাজনীতির নামে কোন্দল, কাঁদা ছোড়াছুড়ি ও ঐক্যবিধ্বংসী হিংসে-বিদ্বেষের যে বুনিয়াদ রাখা হয় নিজেদের মধ্যে তার কারণেও ওলামায়ে কেরাম এ ধরনের দলীয় রাজনীতি থেকে বহু দূরে। তা সত্ত্বেও যদি দলীয় রাজনীতিতে সাফল্যের কিছু হতো তবে ওলামায়ে কেরাম অবশ্যই সমর্থন যোগাতেন। এর অনন্য উদাহরণ হচ্ছে তুরস্কের এরদুগান। এরদুগান ওলামায়ে কেরামের কাছে কিছুই না, কিন্তু ওলামায়ে কেরাম তাঁকে সমর্থন করেন, কারণ তিনি সফল। সফল মানুষ বলেই এই সমর্থন।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com