সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০৬:১৬ অপরাহ্ন

আল্লামা আহমদ শফির বক্তব্য এবং ইতিহাসের বাস্তবতা

আল্লামা আহমদ শফির বক্তব্য এবং ইতিহাসের বাস্তবতা

আল্লামা আহমদ শফীর সঙ্গে একান্তে কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আল্লামা আহমদ শফির বক্তব্য এবং ইতিহাসের বাস্তবতা

সৈয়দ মবনু : কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের চেয়ারম্যান ও হেফাজতে ইসলামের আমির শায়খুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফি নাকি বলেছেন, খালেদা জিয়া আলেমদের কিছু দেননি। এ জন্য তিনি এখন আপসোস করছেন। বড় বড় আলেমরা কওমি মাদরাসার দাওরা হাদিসকে মাস্টর্সের সমমর্যাদা চেয়েছিলেন কিন্তু কোন সরকারের আমলেই এটির স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনা এ স্বীকৃতি দিয়ে আলেমদের এ মর্যাদা দিয়ে প্রশংসা নিয়ে নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলেমদের সম্মানিত করেছেন। কওমি মাদরাসার দাওরা হাদিসকে মাস্টর্সের সমমর্যাদা দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ।

মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার বারদী ইউনিয়নের বারদী বাজার মারকাজ মসজিদ সংলগ্ন ঈদগাহ্ মাঠে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া সোনারগাঁও শাখার আঞ্চলিক পরীক্ষায় কৃতি শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণ ও ইসলামী মহা সম্মেলনে প্রধান মেহমান হিসেবে আল্লামা শাহ আহমদ শফি এসব কথা বলেন। তিনি এই অনুষ্ঠানে আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাবলিগ জামাতের জন্য অনেক জায়গা জমি দিয়েছেন। ওনার মেয়ে শেখ হাসিনা আমাদেরকে মাস্টার্স পাশের মর্যাদা দিয়েছেন। যা দুনিয়াতে এখনো কেউ দেয় নাই। (সংবাদের সূত্র : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোনারগাঁও সংবাদদাতার সূত্রে দৈনিক নয়াদিগন্ত)।

আল্লামা আহমদ শফির এই কথা নিয়ে অনেক ক্ষুব্ধ, বিশেষ করে বি এন পি, জামায়াত এবং বি এন পি, জামায়াতপন্থী ইসলামিক দলগুলো। তাদের ক্ষুব্ধতার কারণ আল্লামা আহমদ শফির মুখে শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধুর প্রশংসার পাশাপাশি বেগম খালেদা জিয়ার কিছুটা সমালোচনা। বি এন পি-জামায়াতিরা মনে করেন আল্লামা আহমদ শফি পথভ্রষ্ট, তারা বিভিন্ন কৌশলে আল্লামা আহমদ শফিকে শ্রদ্ধাশূন্য খারাপ কথাও বলছেন। তাদের একজন আমাকে বললেন, দেখছেন বৃদ্ধ বয়সে লোকটির লোভ গেলো না, এখনও দালালী করেেছন।

আমি বললাম, এই বক্তব্যে দালালি দেখলেন কোথায়? তিনি তো ঐতিহাসিক সত্যকথাকে স্বীকার করেছেন মাত্র। আল্লামা আহমদ শফি আজ যা মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছেন তা তো আমি ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত আমার ‘দ্রাবীর বাংলার রাজনীতি’ বইতে স্পষ্ট ভাষায় বলেছি। আমি বারবার বলেছি, এদেশের আলেম সমাজ সর্বদা রোজা রেখেছেন, আর ইফতার করেছে বিএনপি-জামায়াত। আলেম সমাজের আন্দোলন-সংগ্রামের বিনিময় বিএনপি-জামায়াত জোট যখন ক্ষমতায় গিয়েছিলো তখন বিনিময়ে তারা আলেম সমাজকে রমজানের ইফতার মাহফিলে এতিমদের মর্যাদা দান ছাড়া এমন কি দিয়েছে? যে শায়খুলহাদিস আল্লামা আজিজুল হক বৃদ্ধ বয়সে আন্দোলন-সংগ্রাম এবং জেল-জুলুমের শিকার হয়ে বিএনপি জোটকে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সহজ করে দিয়েছিলেন সেই শায়খুলহাদিস বিএনপি জোট সরকারের সময় বিনিময়ে এমন কোন মার্যাদা লাভ করেছিলেন যার বিনিময়ে তিনি বাধ্য হয়েছিলে বিএনপি জোট ছেড়ে আওয়ামীলীগের সাথে জোট করতে?

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই পর্যন্ত ভারতবর্ষের ইসলামপন্থী দলগুলোকে একটি বিশেষ মহল ইসলামে, মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ের নামে বারবার ধোঁকা দিয়ে আসছে। এই ধোঁকার বীজ প্রথম রোপন করেছিলো মুসলিম লীগের জিন্না-মোনায়েম মার্কা নেতারা। তখন সর্বভারতীয় রাজনীতিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবী যদিও যৌক্তিক ছিলো এবং শ্লোগানে ছিলো ইসলাম আর অর্থনৈতিক মুক্তির কথা, কিন্তু ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সেখানে সবচে বেশি ধোঁকা খেলেন আলেম সমাজ। যে আলেম স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত করাচিতে তার নিজের বাড়ি এবং মাদরাসাটা পর্যন্ত রক্ষা করতে পারলেন না।

আমি এখানে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই শায়খুল ইসলাম আল্লামা শিব্বির আহমদ উসমানী (র.)-এর কথা বলছি। এ বিষয়ে এখানে দীর্ঘ বলবো না, আপনারা দেখতে পারেন আমার ‘দ্রাবীর বাংলার রাজনীতি’ কিংবা ‘লাহোর থেকে কান্দাহার’ গ্রন্থে এ সম্পর্কিত আলোচনা। বই বাজারে না পাইলে সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ কিংবা প্রগতিশীল পাঠক সংঘ শৈলীর পাঠাগারে দেখতে পারেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় শায়খুল ইসলাম আল্লামা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী (র.) বলেছিলেন, ‘ভারতে মুসলমানরা ক্ষতির মধ্যে রয়েছে আর পাকিস্তানে ইসলাম ক্ষতির মধ্যে আটকে যাবে।’ বাস্তবেও হলো তাই। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাকিস্তানের মুনাফেক শাসকগোষ্ঠি ইসলামের নামে, ইসলামের বাণী বলে বলে মুসলমানদের উপর জুলুম-নির্যাতন-শোষণ চালিয়েছে আমেরিকা-বৃটেনের ইশারা-ইঙ্গিত কিংবা সরাসরি সহযোগিতায়।

কাশ্মীর যে আজও স্বাধীন হতে পারছেন না, এরও প্রধান কারণ পাকিস্তানের মুনাফিক সরকারগুলোর মুনাফিকি। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে এই মুনাফিকরা বাংলার মুসলমানদের উপর কি অমানবিকÑনির্মম জুলুম-ই না করলো ইসলামের নামে। পাক-ভারতে বে-নামাজি এবং শরাবী মুসলিমলীগের শরাবমুক্ত নামাজি ভার্সন জামায়াতে ইসলামী একাত্তরে ইসলামের নামে শাসকদের জুলুম-নির্যাতনের পক্ষ নিয়ে বাংলার বেশিরভাগ আলেম সমাজ এবং দ্বীনদার শ্রেণীকে ধোঁকা দিলো। তারা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে যদিও রাজনৈতিক ময়দানে পাকিস্তানি শাসকদের সাথে পরাজিত হয়েছে, কিন্তু মানুষের ধর্মীয় অনুভতির জায়গাটিতে তারা কিছুটা হলেও স্থান করে নিতে পারায় স্বাধীনতার পরও দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছে। এক্ষেত্রে আলেম-উলামাদের কিছুটা সহযোগিতার কথা অস্বীকার করা যাবে না।

অনেক আলেম ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ময়দানের রাজনীতিতে চলমান রাজনৈতিক অনেক কিছু সম্পর্কে গাফেল থেকে বারবার ধোঁকা খেয়েছেন মুসলিমলীগ এবং জামায়াতে ইসলামীর কৌশলের কাছে। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত ওরা ময়দানে গুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৭৫-এর পর তারা বি এন পির ব্যানারে আবার মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বি এন পি মূলত মুসলিমলীগের স্থানে জায়গা করে নেয়। আগে মুসলিমলীগের সাথে জামায়াতের সখ্যতা ছিলো, পরে তা হয় বিএনপির সাথে। আলেম সমাজ আগেও ধোঁকা খেয়েছেন মুসলিমলীগ-জামায়াতের কৌশলে, এখন ধোঁকা খেয়ে থাকেন বি এন পি-জামায়াতের কৌশলের কাছে। বিগত দিনে বি এন পি-জামায়াত জোট আলেম সমাজকে ব্যবহার করলেও এতিমের মর্যাদা ছাড়া তেমন কিছু দিয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন না।

শায়খুলহাদিসের নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট থেকে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে আসার পূর্বে বিষয়টি ছোট ছোট পরিসরে আলোচিত হলেও শায়খুলহাদিসের খেলাফত মজলিসের সাথে আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক এক্যের চুক্তি বিষয়টিকে বড় আকারে আলোচনায় নিয়ে এসেছিলো। এই আলোচনাকে আরও ব্যাপক করে দিলো আওয়ামীলীগ সরকার কর্তৃক কওমী মাদরাসার টাইটেল ক্লাসের সনদকে মাষ্টার্স-এর মর্যাদা দানের পর আল্লামা আহমদ শফি কর্তৃক আওয়ামীলীগ, শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইসলামী খিদমাতের প্রশংসামূলক বক্তব্যের পর।

এবার আরও ব্যাপকতা লাভ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আলেমদেরকে কিছু দেননি বলে আল্লামা আহমদ শফির বক্তব্যটি। এই বক্তব্যে কিছুটা বাস্তবতা যে নেই তা বলা যাবে না। খালেদা জিয়া আলেমদেরকে একেবারে যে কিছু দেননি তাও বলা যাবে না। আল্লামা আহমদ শফির বক্তব্যেও সেদিকে কিছুটা ইঙ্গিত রয়েছে। মূলত এখানে আল্লামা আহমদ শফি কওমী মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের আলেমদের জন্য এই স্বীকৃতিটি বিশাল একটি পাওয়া, যার জন্য যুগযুগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কওমীপন্থী আলেমদের স্মরণ রাখতে হবে।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com