বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০৬:৪৩ পূর্বাহ্ন

আব্বাজানের বিদায় এবং কাছে না থাকার কষ্ট

আব্বাজানের বিদায় এবং কাছে না থাকার কষ্ট

স্মরণ । শেখ নূরে আলম হামিদী

আব্বাজানের বিদায় এবং কাছে না থাকার কষ্ট

১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ জন্মভূমি ছেড়ে মা বাবা ভাই বোন সহ আপনজনকে ছেড়ে আমার প্রবাস জীবন শুরু হয়। আসার দুই দিন পর থেকে ইমামতি ও মাদরাসায় পড়ানোর গুরু দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হই। সেই দায়িত্বের সুবাদে অনেকের শেষ বিদায়ে শরিক হয়েছি জানাযার নামাজ পড়িয়েছি তবে সব সময় ভিতরে এক ধরনের ভয় কাজ করত জন্ম দাতা মা বাবার শেষ বিদায়ে শরিক হতে পারব কি না। গত ২৪ নভেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার দিন গত রাত মা জননী সুস্থ অবস্থায় হঠাৎ মাওলার ডাকে সাড়া দিয়ে আমাদেরকে এতিম করে চলে যান যার দরুন সুদূর প্রবাস থেকে আর জানাযায় শরিক হতে পারিনি অবশ্য পরের দিন আমরা তিন ভাই দেশে গিয়ে মায়ের কবর যিয়ারত করেছি।

গত সেপ্টেম্বরে আব্বা অসুস্থ হয়ে যখন হসপিটালে ভর্তি হন তখন আমি আব্বাকে নিয়ে এক স্বপ্ন দেখি। ঘুম ভাঙ্গার পর স্বপ্নের অর্থ বুঝে পেরেশান হয়ে যাই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই দেশে চলে যাব। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারনে দেশে যেতে চাইলেই যাওয়া যায় না। সব এয়ারলাইন্স ফ্লাইট করতেছে না। সহজে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না,পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত মূল্য চাচ্ছে। সব চেয়ে জটিল যে বিষয় ছিল দেশে যেতে হলে প্রথমে করোনা সার্টিফিকেট নিতে হবে নিদৃষ্ট সেন্টার থেকে সিরিয়েল ও রিপোর্ট পেতে কয়েকদিন সময় লেগে যায় রিপোর্ট পাওয়ার ৭২ ঘন্টার ভিতরে ফ্লাইট করতে হবে নতুবা রিপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে আর ফ্লাইট করা যাবেনা। এই জটিল পরিস্থিতিতে টিকিট বুকিং দিলাম অন্য দিকে তাড়াতাড়ি সিরিয়েল পাওয়ার জন্য হন্য হয়ে দেশের বিভিন্ন সেন্টারে খুজতে খুজতে এক সময় করোনা টেস্ট এর জন্য বুকিং দিলাম।

দেশে যাওয়ার জন্য যখন পেরেশানী করছি তখন দুই চোখ ইনফেকশন করে, কিছু জর উঠে, করোনা টেস্ট এর জন্য সেম্পল দিয়ে আসি। এদিকে জর বারতে থাকে দুই দিন পর রেজাল্ট আসে আমার করোনা পজিটিভ তাই দেশে যাওয়ার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। এক সপ্তাহ জরে ভুগি হটাৎ একদিন দাড়ানো থেকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই, জরুরী এম্বোলেনস কল করা হয় ডাক্তাররা প্রথমিক পরীক্ষা করে হসপিটাল নিয়ে যায় অক্সিজেন, সেলাইন, এনটিবায়েটিক, এর বিতর দিয়ে দুই সপ্তাহ চলে যায়। দুনিয়ার সব কিছু থেকে অনেক দুরে চলে গিয়েছিলাম, কখনও মনে হয়েছে আমি আর ফিরতে পারবনা। আল্লাহ পাকের অশেষ মেহেরবানী ও সবার দোয়ায় আমি আবার ফিরে এসেছি আপনজনের কাছে।

আমার অসুস্থতার কথা আব্বাকে না জানানোর কথা বলেছি কারন তিনি হসপিটালে আই, সি, ইউতে আছেন। ইন্তেকাল এর চার দিন আগে হটাৎ আমাকে দেখতে চেয়েছেন, আমি তখন হসপিটালে, আমার অক্সিজেন চলছে, মুখে মাক্স লাগানো, আমি মাক্স খুলে স্বাভাবিক হয়ে বসি, যাতে বুঝতে না পারেন আমি হসপিটালে।

ভিডিও কলে অনেক্ষন আমার দিকে চেয়ে থাকলেন আমিও আব্বাজানের দুর্বল নুরানী চেহারার দিকে অপলক চেয়ে থাকলাম কি যেন বলছেন কিন্তু মাক্স পড়া থাকায় আমি শুনতেছি না তবে আমার শুনার চেয়ে দেখার আগ্রহটাই ছিল বেশি। আর এ দেখাটাই ছিল আব্বাজানের সাথে আমার শেষ দেখা।

ইন্তেকাল এর তিন দিন পূর্বে হসপিটাল থেকে বাড়ীতে চলে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে গেছেন কোন অবস্থাতেই থাকতে রাজী হচ্ছেন না একজন আই, সি, ইউ রুগিকে কি ভাবে বাড়ীতে নেওয়া যায়, একটু এদিক সেদিক হলে অক্সিজেন লেভেল কমে যায়, কোন অবস্থাতেই ডাক্তাররা মানছেন না। বাড়ী থেকে চাচারা আসলেন সবাইকে নিয়ে পরামর্শ করা হল আমাকেও জিজ্ঞাস করা হল কি করা যায় আমি বল্লাম সকলের পরামর্শের উপর আমার মত আছে তবে আব্বা যে ভাবে বাড়ীতে চলে যেতে চাচ্ছেন আমার মনে হয় বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া ভাল, আমার মনের কথা কাউকে বলিনি আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি আব্বা নিজের জীবন যৌবন বিসর্জন করা প্রিয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ মাদরাসা কলিজার ধন ছাত্র উস্তাদদেরকে শেষ বারের মত দেখা দিয়ে শান্তির ঘুম ঘুমাতে চাচ্ছেন।

বাড়ীতে আই, সি,ইউ এর ব্যবস্থা করে নিয়ে যাওয়ার কথা বলায় আব্বার মুখে হাসি ফুটে। গভীর রাতে বাড়ীতে নিয়ে আসা হয় কিন্তু বাড়ীতে ঢোকার আগে প্রিয় মসজিদ মাদরাসা ছাত্র উস্তাদদেরকে দেখতে চান এম্বোলেনসে রেখে সব কিছু দেখানো হয়। এক দিন বাড়ীতে ছিলেন রাতে আবার শরীর খারাপ হতে লাগল কোন অবস্থাতেই হসপিটালে যেতে চাচ্ছেন না ভাই বোনদের কান্না দেখে রাজি হন। কয়দিন যাবত আমার কানে একটি শব্দ ভেসে আসছে আমি শুধু শুনি ইন্না লিল্লাহ এর আওয়াজ। একটুপরে শুনতে পেলাম আব্বাকে নিয়ে মৌলভীবাজার হসপিটালে যাওয়া হচ্ছে আমি সাথে সাথে আমার বাচ্চাদেরকে বল্লাম তুমাদের দাদা ছাব আর বাড়ীতে ফিরবেন না। আমি অপেক্ষা করছি বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলনা আমার ভাগ্না ফোন করতেই বল্লাম আব্বা চলে গেছেন আমাদেরকে এতিম করে। ভাগ্না অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করল আমি কি ভাবে জানলাম।

৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দিন গত রাত ১টা ৪৫ মিনিটে ফেদায়ে ইসলাম, জানেশীনে বরুনী, শায়খুল হাদিস, আল্লামা খলিলুর রহমান হামিদী বরুনী রহঃ আমার আব্বাজান আমাদেরকে ছেড়ে মাওলার ডাকে সাড়া দিয়ে আখেরাতের পথে পাড়ি জমান। এখানে একটি আজিব মিল খুঁজে পাই আমার আম্মা ও আব্বা একি বারে একি সময়ে দুনিয়া ছেড়ে চলে যান আর উভয়ের জানাযাও জুমআর দিন জুমআর নামাজের পর অনুষ্ঠিত হয়। দাদাজান হযরত শায়খে বরুনী রহঃ এর ডান পাশে কবর দেওয়া হয় আর আব্বার কবরের টিক পিছনে আম্মার কবর দেওয়া হয়। আমার সবচেয়ে বড় আফসোস আমি এক হতভাগা সন্তান আমি মা বাবার শেষ বিদায় নিজ হাতে করতে পারিনি।

জানাযায় শরিক হতে পারিনি। কবরে এক মুষ্টি মাটি দিতে পারিনি। তবে আশা রাখছি আল্লাহ পাক জান্নাতে একসাথে করে সব কষ্ট দুর করবেন। সবার কাছে আব্বাজান ও আম্মাজান এর জন্য দোয়া চাই আর আমার মত মা হারা বাবা হারাদের জন্য দোয়া করি।

ইংল্যান্ডের ওয়ালছল শহর থেকে

১৩ নভেম্বর ২০২০, শুক্রবার

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com