শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:২৩ অপরাহ্ন

আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ একজন মুক্তি সংগ্রামের সিপাহসালার

আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ একজন মুক্তি সংগ্রামের সিপাহসালার

আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ একজন মুক্তি সংগ্রামের সিপাহসালার

মাসউদুল কাদির : শোকের মাস আগস্ট। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট ইন্তেকাল করেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সিপাহসালার মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। বংশীয়ভাবে তার রক্তেই নেতৃত্বের গুণ ছিল। সিরাজগঞ্জের এই আলেম ইংরেজ খেদাওয়ের মতো আন্দোলনে অংশ নিয়ে যে চেতনা পেয়েছিলেন তা বলবৎ ছিল মৃত্যু আগে পর্যন্ত।

ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস টানলে মাওলানা তর্কবাগীশের নাম ওঠে আসে অনায়াসে। বাংলাদেশের আলেম রাজনীতিকদের মধ্যে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। তবে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাম ইংরেজ খেদাও আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মুক্তির লড়াইয়ে সমোজ্জ্বল আলোচিত। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তিনি ছিলেন সরব।

কীভাবে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ যুক্ত হয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনে। তিনি সে গল্প নিজেই লিখেছেন, আমি তখন পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের সদস্য। ২০ ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিন সরকার ঢাকায় জারি করেন ১৪৪ ধারা। কাজেই জনসভা-মিছিল ইত্যাদি নিষিদ্ধ। রাস্তায় রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ ও মিলিটারি। এরই মধ্যে দুপুর ২টার দিকে অ্যাসেম্বলি হাউসে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি দলের সভা বসে। আমার মনে পড়ে, একুশে ফেব্রুয়ারি পরিষদের সভা আহ্বান করা হয়। তখন বাইরে মুহুর্মুহু রাইফেলের গর্জন। কিন্তু কোনো মন্ত্রী কিংবা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। কারও কোনো উদ্যোগ নেই। মাঝে মাঝে গুলি, কাঁদানে গ্যাস ও শেলবর্ষণের প্রচণ্ড শব্দে আমি শিউরে উঠছিলাম। একসময় হাউস থেকে বেরিয়ে আসি। দেখি রাজপথ জনশূন্য। রাইফেল ও লাঠি হাতে স্থানে স্থানে দাঁড়িয়ে রয়েছে পুলিশ ও সৈন্যরা। আমি মেডিকেল কলেজের দিকে অগ্রসর হলাম। কলেজের কাছাকাছি এসে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে আমি অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি। ছাত্ররা চিৎকার করছে। দূর থেকে তারা গলা ফাটিয়ে আইন সভার সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে বেরিয়ে এসে পরিস্থিতি দেখার জন্য। আহত ছাত্ররা আর্তনাদ করছে। কারও কারও কাপড়ে ফেনাযুক্ত রক্ত। শুনতে পেলাম বহু ছাত্র হতাহত হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে আমার সক্রিয় রাজনীতির চল্লিশ বছরের জীবনে হাসপাতালের অভ্যন্তরে পুলিশের গুলিবর্ষণের এমন ঘটনা আমি দ্বিতীয়টি আর দেখিনি। মর্মান্তিক এ দৃশ্য সহ্য করতে পারলাম না। হাউসের কাছে প্রতিবাদ জানানোর জন্য, অবস্থা বিবৃত করার জন্য ছুটে এলাম অ্যাসেম্বলি হাউসে।

বিকাল তিনটা ত্রিশ মিনিট। স্পিকার আবদুল করিম আসন গ্রহণ করলেন, আমি তখন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম, জনাব স্পিকার, প্রশ্নোত্তরের পূর্বে আমি আপনার কাছে একটি নিবেদন করতে চাই। ভবিষ্যতের আশা-ভরসা দেশের ছাত্ররা যখন পুলিশের গুলিতে জীবন দিচ্ছে তখন আমরা এখানে বসে সভা করতে পারি না। আমার দাবি, প্রথমে ইনকোয়ারি তারপর হাউস বসবে। এ নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে আমার দীর্ঘ বাকবিতণ্ডা হয়। তিনি বারবার আমাকে অ্যাসেম্বলির আইন মোতাবেক আচরণ করতে বলেন। আমারও এক কথা, যে সরকার আমাদের সন্তানদের গুলি করে হত্যা করছে, সেই সরকারের আইন মানা যায় না। আমি মানব না। আগে প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসে হাউসে বিবৃতি দিতে হবে, তারপর অধিবেশন চলবে। তার পূর্বে নয়। তুমুল বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে স্পিকার অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। মুলতবির পর অধিবেশন আবার শুরু হলে এক বিবৃতির মাধ্যমে এহেন জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে আমি পরিষদ ভবন ত্যাগ করি এবং চিরতরে মুসলিম লীগ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিই।

(ভাষা আন্দোলনের সিংহপুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশের পৌত্র সৈয়দ হাদি তর্কবাগীশ এর প্রবন্ধ থেকে চয়নকৃত)

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেমন সরকারের মাথা খারাপ করে দিয়েছিল তেমনি মুসলিম নেতারাও যুগপৎ দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে অবদান রেখেছিলেন।

জন্ম  : ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলাধীন তারুটিয়া গ্রামে এক পীর বংশে জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। ১৩০৩ খৃষ্টাব্দে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাগদাদ থেকে বাংলাদেশে আসেন তাঁর পূর্ব পুরুষ বড়পীর হযরত আবদুল কাদির জিলানী রহ.-এর বংশধর শাহ সৈয়দ দরবেশ মাহমুদ। ছোট বেলা থেকেই তিনি সংগ্রামী মানসকিতা পোষণ করতেন। শৈশবেই তিনি দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য আদায়ে মহাজনদের বিরুদ্ধে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন।

ব্রিটিশ থেকে বাংলাদেশ : মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ শৈশব থেকে তারুণ্যে জ্ঞানার্জন করেন। উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তিনি দারুল উলূম দেওবন্দ গমন করেন। ভারতের সাহারানপুর মাদরাসাতেও তিনি অধ্যয়ন করেন। একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি তিনি তর্কশাস্ত্রেও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তর্কশাস্ত্রে অসামান্য অবদান রাখায় এজন্যই তর্কবাগীশ উপাধিতে তিনি ভূষিত হন।

জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি কোথাও তিনি আন্দোলন সংগ্রাম থামিয়ে দেননি। ১৯১৯ সালে তিনি খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন। সলংগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি কারাগারে অন্তরীণ হন। ১৯২২ সালে ২২ বছর বয়সে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে এন্ট্রান্স পরীক্ষাও দিতে পারেননি এই আলেম। এই সলংগা আন্দোলন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে “রক্তসিঁড়ি” হিসেবে পরিচিত ৷

ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ পরতে পরতে যেনো অবদান রেখেছেন। দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠাই পেয়েছিল ইংরেজদের বিরোধিতা করে। ইংরেজদের কোনো কিছু স্পর্শ না করার ঘোষণা দিয়ে যে সংগ্রামের যাত্রা হয় তাই দেওবন্দ। দেওবন্দের সেই চেতনাই তার ভেতরে প্রভাবিত করেছিল। সত্যের পক্ষে লড়াইয়ে তিনি আর কখনো দমে যাননি।  ১৯৩৩ সালে রাজশাহীর চাঁটকৈড়ে নিখিলবঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলন আহ্বান করে ঋণ সালিশী বোর্ড আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাখেন ৷ তিনি ১৯৩৭ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নাটোরে কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন ৷ তিনি গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন ৷ ১৯৩৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তিনি বাংলা, আসাম ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজে অবদান রাখেন৷ ১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ৷ তিনি অবিভক্ত বাংলার এম.এল.এ হিসেবে তৎকালীন ব্যবস্থাপক পরিষদে পতিতাবৃত্তি নিরোধ, বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও বিনা ক্ষতি পূরণে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব উত্থাপন করেন ৷

১৯৫২ সালে ২২শে ফেব্রুয়ারি মুসলীম লীগ ত্যাগ করে প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী দল গঠন করেন এবং নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয় ৷ আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদে ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। মাওলানা তর্কবাগীশ ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ৷ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ৷

১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান হওয়ার পর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন জেগে ওঠে। ১৯৫২ সালের সফল আন্দোলনের পর এই স্বপ্ন আরও প্রবলতর হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি নির্মাণে যারা অবদান রেখেছেন তাদের অন্যতম ছিলেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। লেখালেখিও করতেন তিনি। কথা সাহিত্য নির্মাণও করতেন। নিচে তার রচিত কয়েকটি গ্রন্থের নাম তুলে ধরা হলো-শেষ প্রেরিত নবী, সত্যার্থে ভ্রমণে, ইসলামের স্বর্ণযুগের ছিন্ন পৃষ্ঠা, সমকালীন জীবনবোধ, স্মৃতির সৈকতে আমি, ইসমাইল হোসেন সিরাজী ইত্যাদি ৷

এই দিনে তাকে স্মরণে একটাই কথা বলতে চাই। আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দিন। আমীন।

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com