সোমবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২১, ০১:১২ অপরাহ্ন

আওরঙ্গাবাদ ভ্রমণ এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব

আওরঙ্গাবাদ ভ্রমণ এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব

আওরঙ্গাবাদ ভ্রমণ এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব

চৌধুরী আতিকুর রহমান

মহম্মদ বিন তুঘলক খ্যাত দৌলতাবাদ ভ্রমণ শেষে আমাদের পরবর্তী ভ্রমণস্থল ছিল খুলদাবাদ। খুলদাবাদ হল প্রবল প্রতাপান্বিত সম্রাট আওরঙ্গজেবের সমাধিস্থল। সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিশাল সাম্রাজ্য আফগানিস্থান থেকে কেরালার দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু সম্রাটের নিজ আয় ছিল কোরআন নকল ও টুপি সেলাই। তাঁর পিতা শাহজাহানের সমাধি রচনায় খরচ হয়েছিল ২২ লক্ষ টাকা। এমনকি আওরঙ্গাবাদের ছোটা তাজ ‘বিবি কা মকবরা’ নির্মিত হয়েছিল আওরঙ্গজেবের স্ত্রী রাবেয়া দুরানির স্মৃতি রক্ষার্থে তাঁর পুত্র আজম শাহ দ্বারা।

আওরঙ্গজেবের সমাধি রচনায় খরচ হয় মাত্র ১৪ টাকা। প্রজাদের করের টাকা তিনি নিতে চাননি। আর প্রজাদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু।

‘মা’আশির ই আলমগিরি’ (সাকি মুস্তাইদ খান লিখিত আওরঙ্গজেবের জীবনী)-তে সম্রাটের অন্তিম সময়ের বর্ণনা পাওয়া যায়, সম্রাট আলমগীরের অন্তিম সময়ের দিনলিপি।

২০-শে জানুয়ারী ১৭০৬, রবিবার দাক্ষিণাত্য বিজয়ের পর সম্রাট আহামদনগরে এসে পৌঁছলেন। প্রায় এক বছর অস্থিরতার মধ্যে থাকার পর শাসনকালের একান্নতম বছরে ২৬-শে ডিসেম্বর ১৭০৬-এ সম্রাট শারীরিকভাবে অত্যন্ত পিড়িত হয়ে পড়লেন। কিছুদিন পর সামান্য সুস্থ হয়ে স্বভাবমত তিনি সাধারণ বিচারের আদালতে বসলেন। এর মধ্যেই শাহ আলীজাহকে পাঠালেন মালওয়ার গন্ডগোল থামাতে এবং শাহজাদা কামবক্সকে পাঠালেন বিজাপুরের সুবাদার হিসাবে।

৪-৫ দিন পর আবার সাংঘাতিক রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। অত্যন্ত পিড়িত হওয়া সত্ত্বেও প্রকৃতিদত্ত শক্তি এবং আত্মিক বলে আদালতে আসতে লাগলেন। এত অসুস্থতার মধ্যেও তিনি বা’জামাত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ে এবং ইসলামের খুঁটিনাটি পালনে গাফিলতি করেননি। তিনি সবসময় আওড়াতেন, “চোখের পলকে, এক মুহুর্তে, এক শ্বাসে, দুনিয়ার অবস্থা যাবে পালটে।” বৃহস্পতিবার বিকেলে সম্রাটের কাছে হামিদউদ্দিন খান বাহাদুরের একটি আরজি পেশ করা হল, একটি হাতির দাম ৪০০০ টাকা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের জন্য কাজি উল কুজ্জাত মুল্লা হায়দারকে দেওয়া হোক। এই মর্মে সম্রাট একটি চিঠি লিখলেন এবং শিরোনামে লিখলেন,”এই নগন্য (Wortless-অকর্মা) ব্যক্তিকে প্রথম স্তরে তুলে নিন।”সেই সময় দেখেই মনে হচ্ছিল তিনি পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছেন। শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি সম্রাট বাইরে এসে তাঁর শয়নাগারে ফজর নামাজ আদায় করলেন এবং আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকলেন। অচেতন অবস্থা থেকে বার হওয়ার জন্য এবং শ্বাসকষ্টের মধ্যেই তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলি তসবিহর উপর ঘুরছিল। তাঁর জিহ্বা বারবার উচ্চারিত করছিল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- নেই কোন উপাস্য আল্লাহ ছাড়া। দিনের চার ভাগের এক ভাগ পার হয়ে গেলে তিনি নিজে থেকেই বললেন,”শুক্রবার মারা গেলে এক মহান আশীর্বাদ”- বলেই তিনি চলে গেলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর ১৩ দিন। তিনি জন্মান মালওয়ার কাছে দোহাদে ১৬১৮-য়। তাঁর রাজত্বকাল ছিল ৫০ বছর ২ মাস ২৮ দিনের।

কাজী, আলেম ও সাধু ব্যক্তিগণ তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, সমাধিস্থ করার জন্য দেহটিকে কাফন ও সজ্জিত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। জানাজা নামাজ পড়া হলে দ্বিতীয় কন্যা জিন্নতউননেশা বেগমের অনুরোধে কফিনবন্দী (খোয়াব গাহ-বেড চেম্বার) করে রাখা হল, শাহজাদা মোহাম্মদ আজম ২৫ ক্রোশ দূর থেকে শনিবার এসে পৌঁছালেন। পৌঁছেই গভীর শোকে ডুবে গেলেন। সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি শাহজাদা গভীর শোকে আপ্লুত হয়ে তাঁর দেহ কাঁধে করে বিচারসভায় (দিওয়ান ই আদালত) বয়ে নিয়ে গেলেন, তারপর শ্রদ্ধার সঙ্গে পথ দেখিয়ে পৌঁছে দিলেন।
সম্রাটের ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় শায়েখ জৈনুদ্দিনের সমাধিস্থলের চত্বরে। স্থানটি আওরঙ্গাবাদ থেকে ৮ ক্রোশ দূরে এবং দৌলতাবাদ থেকে ৩ ক্রোশ দূরে। লাল পাথরের একটি চতুষ্কোণ (চবুতরা) প্ল্যাটফর্ম, দৈর্ঘ্যে তিন গজ ও প্রস্থে আড়াই গজ সমাধির উপর স্থাপন করা হয়। প্রস্তর চবুতরাটির মাঝামাঝি জায়গায় প্রমাণ সাইজের কেটে বাদ দিয়ে দেওয়ায় কবরের মাটি দেখা যায় এবং সুগন্ধি ফুল গাছ রোপন করা হয়। আমি দেখেছিলাম বন তুলসীর চারা। উক্ত স্থানটির নাম খুলদাবাদ এবং আওরঙ্গজেবের সমাধিস্থলকে বলা হয় ‘খুলদ মকান’।

হামিদউদ্দিন খানকে বলা হত ‘নিমচা ই আলমগীরী’ বা আলমগীরের তরবারি। তিনি সম্রাটের শোক যাত্রার কোন অংশ থেকেই বাদ পড়েননি। পায়ে হেঁটে শবদেহের সঙ্গে গিয়েছিলেন। দরবেশের পোশাক পরে রওজার পাশেই থাকার জায়গা করে নেন।

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com